ইজরায়েল-আমেরিকা সংঘাতে টালমাটাল বিশ্বরাজনীতি। এই চরম অস্থিরতার আবহে দাঁড়িয়ে শান্তির বার্তা দিল ভারত। সোমবার সংসদে দাঁড়িয়ে বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, ‘আলোচনা ও কূটনীতিই শান্তির একমাত্র রাস্তা’। পেশি প্রদর্শন নয়, বরং সংলাপের মাধ্যমেই যে পরিস্থিতির মোকাবিলা সম্ভব, সেই অবস্থানই ফের স্পষ্ট করল নয়াদিল্লি। যুদ্ধের আবহে ভারতের রণকৌশল এবং প্রবাসী ভারতীয়দের সুরক্ষা নিয়ে সোমবার রাজ্যসভা ও লোকসভায় দীর্ঘ বিবৃতি দেন বিদেশমন্ত্রী।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের মাটিতে আমেরিকা ও ইজরায়েলের যৌথ হামলায় সুপ্রিম লিডার আয়াতোল্লা খামেনেইয়ের মৃত্যুর পর থেকে পরিস্থিতি কার্যত হাতের বাইরে চলে গিয়েছে। তেহরানের পাল্টা জবাবে থরথর করে কাঁপছে পশ্চিম এশিয়া। এই সঙ্কটজনক মুহূর্তে জয়শঙ্কর বলেন, ‘আলোচনা ও কূটনীতি দুই তরফের উত্তেজনা হ্রাসের একমাত্র পথ। আমাদের সরকার গত ২৮ ফেব্রুয়ারি বিবৃতি জারি করে এই যুদ্ধ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে সব পক্ষকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছিল। আমরা বিশ্বাস করি উত্তেজনা কমাতে সকলেরই সংলাপ ও কূটনৈতিক পথ অনুসরণ করা উচিত।’ বিদেশমন্ত্রী জানান, মধ্যপ্রাচ্যের এই আগ্নেয়গিরির ওপর কড়া নজর রাখছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।
যুদ্ধের গ্রাসে আটকে পড়া হাজার হাজার ভারতীয়র নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই
এখন সাউথ ব্লকের পয়লা নম্বর লক্ষ্য। তেহরানের ভারতীয় দূতাবাস ২৪ ঘণ্টা সক্রিয় রয়েছে। বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে সেখানে পড়তে যাওয়া ভারতীয় পড়ুয়াদের ওপর। ১ মার্চ প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে নিরাপত্তা সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির (সিসিএস) বৈঠকেও ভারতীয়দের সুরক্ষা নিয়ে বিশদে আলোচনা হয়েছে বলে জানান জয়শঙ্কর। পশ্চিম এশিয়ার এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেই ভারতের একটি মানবিক এবং কৌশলগত পদক্ষেপের কথা প্রকাশ্যে আনেন বিদেশমন্ত্রী। তিনি জানান, ১ মার্চ তিনটি ইরানি জাহাজকে ভারতীয় বন্দরে আশ্রয়ের অনুমতি দিয়েছে নয়াদিল্লি। এর মধ্যে ‘আইআরআইএস লাভান’ নামের একটি ইরানি নৌবাহিনীর জাহাজ কেরলের কোচি বন্দরে নোঙর করেছে।
ভারতের এই সিদ্ধান্তে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন ইরানের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। জয়শঙ্কর বলেন, তইরানের নৌবাহিনীর জাহাজ ‘আইআরআইএস লাভান’-কে কোচি বন্দরে আশ্রয় দেওয়ার জন্য সে দেশের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি ভারতকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।দ তবে খামেনেইয়ের মৃত্যুর পর সে দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা যে রীতিমতো কঠিন কাজ, তাও স্বীকার করে নিয়েছেন তিনি। যুদ্ধের ছায়ায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের বাজারে আগুন লাগার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ভারতের অর্থনীতির ওপর যাতে এর আঁচ না পড়ে, সে দিকেও সতর্ক সরকার। আমেরিকা রাশিয়ার তেলের ওপর ভারতের জন্য ৩০ দিনের বিশেষ ছাড় ঘোষণা করলেও, ভারত কোনো চাপের মুখে নতিস্বীকার করবে না বলে জানিয়ে দিয়েছেন বিদেশমন্ত্রী। জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে মোদী সরকারের অবস্থান অনড়। জয়শঙ্করের কথায়, ‘ভারতীয়দের স্বার্থই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাবে। আমাদের জাতীয় স্বার্থ সর্বদাই গুরুত্বপূর্ণ।’
খরচ, ঝুঁকি এবং জোগানের ভারসাম্য বজায় রেখেই ভারত পরবর্তী পদক্ষেপ নেবে। তিনি আরও যোগ করেন, ‘জ্বালানি-নিরাপত্তা নিয়ে সরকার দায়বদ্ধ রয়েছে। খরচ, ঝুঁকি, জোগান কেমন রয়েছে, সেই বিষয়গুলি মাথায় রাখা হচ্ছে।’ সংসদে জয়শঙ্করের এই বিবৃতি ঘিরে অবশ্য রাজনৈতিক পারদও চড়েছে। কংগ্রেস-সহ বিরোধী দলগুলি এই স্পর্শকাতর ইস্যু নিয়ে দীর্ঘ আলোচনার দাবি জানায়। বিরোধীদের হইহট্টগোল ও ওয়াকআউটের জেরে লোকসভার অধিবেশন দুপুর ৩টে পর্যন্ত মুলতুবি করে দিতে হয়। তবে সব বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠে ভারত এটাই বুঝিয়ে দিল যে, যুদ্ধ নয়, বুদ্ধের দেশ সর্বদা শান্তির পক্ষেই দাঁড়াবে। এখন দেখার, ভারতের এই শান্তিবার্তা মধ্যপ্রাচ্যের বারুদের স্তূপে কতটা জল ঢালতে পারে। ফাইল ফটো ।













