Facebook
Twitter
LinkedIn
Threads
X
Email
WhatsApp
Telegram
StumbleUpon
Pinterest
Skype
Pocket

কর্ণসুবর্ণের গর্ভে শশাঙ্কের স্বর্ণযুগ

কর্ণসুবর্ণের গর্ভে শশাঙ্কের স্বর্ণযুগ

মুর্শিদাবাদের লালমাটির নিচে চাপা পড়ে আছে পাল, সেন এবং গুপ্ত যুগের গৌরবগাথা। ভাগীরথী তীরের এই প্রাচীন জনপদ একসময় ছিল বাংলার ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু। বিশেষ করে কর্ণসুবর্ণ এবং মহীপাল অঞ্চলের ধ্বংসাবশেষ প্রমাণ করে যে, কয়েক হাজার বছর আগেও এই ভূমি স্থাপত্য ও ভাস্কর্যে ছিল অনন্য। খননকার্যের ফলে বেরিয়ে আসা বুদ্ধমূর্তি, শিবলিঙ্গ ও বিশালাকার স্তূপগুলি জানান দিচ্ছে এক সমৃদ্ধ হিন্দু-বৌদ্ধ যুগের কথা। চিনা পরিব্রাজক হিউ-এন-সাং-এর বর্ণনায় যে রক্তমৃত্তিকা মহাবিহারের উল্লেখ ছিল, আজ তা ইতিহাসের পাতায় ধ্রুব সত্য হিসেবে প্রমাণিত।

কর্ণসুবর্ণের বিস্তৃতি একসময় ছিল চোখে পড়ার মতো। হিউ-এন-সাং ৬৩৭ খ্রিষ্টাব্দে এখানে এসে লিখেছিলেন, ‘কর্ণসুবর্ণ নগরী ২০ লি অর্থাৎ ৭ মাইল বিস্তৃত ছিল।’ বর্তমানে ভাগীরথীর গর্ভে নগরের অনেকটা অংশ তলিয়ে গেলেও পশ্চিমের গ্রামগুলোতে আজও ইতিহাসের চিহ্ন স্পষ্ট। ১৯২৮ সালে রাক্ষসী ডাঙ্গায় এবং পরবর্তীতে অধ্যাপক সুধীররঞ্জন দাসের নেতৃত্বে রাজবাড়ি ডাঙ্গায় খনন চালিয়ে যে বিহারের হদিশ মিলেছে, তা আন্তর্জাতিক স্তরেও আলোচনার বিষয়। মাটির পাঁচটি স্তর থেকে খ্রিষ্টিয় দ্বিতীয় শতাব্দী থেকে নবম শতাব্দী পর্যন্ত সুদীর্ঘ সময়ের বিবর্তনের ছবি উঠে এসেছে।

অশোকের স্মৃতি আজও এই জনপদে অম্লান। কথিত আছে, সম্রাট অশোক এখানে চারটি স্তূপ নির্মাণ করেছিলেন। হিউ-এন-সাং তাঁর বিবরণীতে উল্লেখ করেছেন, ‘রাজা অশোক কর্ণসুবর্ণে চারটি স্তূপ নির্মাণ করে দিয়েছিলেন।’ সম্প্রতি ভীমকি তলায় প্রাপ্ত একটি প্রস্তরখণ্ডের খোদিত মূর্তির সঙ্গে অশোকের মূর্তির সাদৃশ্য মেলায় সেই সম্ভাবনা আরও জোরালো হয়েছে। যদি এটি সত্য হয়, তবে এই জনপদের ইতিহাস প্রায় আড়াই হাজার বছরের প্রাচীন। শশাঙ্কের মৃত্যুর পরও কর্ণসুবর্ণের গুরুত্ব কমেনি। পীর তুরকানের কবর বা বেণেদীঘির মতো স্থানগুলো প্রমাণ করে যে, মুসলিম শাসনের সূচনা পর্যন্ত এই অঞ্চল ছিল অত্যন্ত প্রাণবন্ত।

পাল আমলের আভিজাত্য ছড়িয়ে আছে সাগরদীঘি থানার মহীপাল অঞ্চলে। প্রায় ৩০ মাইল পরিধির এই প্রাচীন নগরী সম্ভবত প্রথম মহীপালের শাসনকাল থেকে রামপালের বরেন্দ্রভূমি উদ্ধার পর্যন্ত পাল সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল। আজিমগঞ্জ থেকে গিয়াসাবাদ পর্যন্ত বিস্তৃত এই এলাকায় ছড়িয়ে আছে অজস্র ঢিপি আর প্রস্তরস্তম্ভ। গ্রামবাসীরা আজও ষষ্ঠীতলায় বুদ্ধমূর্তি ও শিবলিঙ্গ সযত্নে আগলে রেখেছেন। মহীপালের অমর কীর্তি হলো বিশাল সাগরদীঘি। এই দীঘির মাঝখানে থাকা রহস্যময় প্রস্তরস্তম্ভটি ইতিহাসের এক অনন্য সাক্ষী, যা কেবল জল কমলেই দৃশ্যমান হয়।

সাগরদীঘির কাছেই চন্দনবাটী গ্রামটি প্রত্নতাত্ত্বিকদের কাছে এক সোনার খনি। সেখানে মাটির নিচে ঢাকা পড়ে থাকা একটি প্রাচীন শিবমন্দিরের সন্ধান মিলেছে। বিশালাকার কালো পাথরের গৌরীপট্ট ও শিবলিঙ্গটি সপ্তম বা অষ্টম শতাব্দীর ভাস্কর্যরীতির কথা মনে করিয়ে দেয়। বড় বড় ইটের সেই নির্মাণশৈলী কেবল পাল বা সেন আমলের নয়, তার চেয়েও প্রাচীন হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছেন না বিশেষজ্ঞরা। একইভাবে ভরতপুরের গীতগ্রাম বা পাঁচথুপীর বারকোণার দেউল আজও এক বিশাল বৌদ্ধ স্তূপের ধ্বংসাবশেষ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

মুর্শিদাবাদের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে থাকা এই প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ কেবল পর্যটনের বিষয় নয়, বরং তা বাংলার নাড়ির স্পন্দন। সন্ন্যাসী ডাঙ্গা বা যদুপুরের মতো স্থানগুলোতে পূর্ণাঙ্গ খননকার্য চালানো হলে হয়তো ইতিহাসের অনেক অজানা অধ্যায় উন্মোচিত হবে। গড়ের পাহাড়ের পরিখাযুক্ত দুর্গ কিংবা কুসুমখোলার ধ্বংসাবশেষ আজও গবেষকদের হাতছানি দেয়। প্রাচীন বাংলার এই হৃতগৌরবকে পুনরুদ্ধার করা এখন সময়ের দাবি। ছবি সংগৃহিত ।

READ MORE.....