শারদোৎসবের সূচনা রাত পোহালেই। দেবীপক্ষের আবহ শুরু পুজোর শেষ মুহূর্তের ব্যাস্ততায় দিনরাত এক করছেন নবদ্বীপের ঐতিহ্যবাহী পেতলশিল্পীরা। দুর্গাপ্রতিমার হাতের পেতলের অস্ত্র, রাজকীয় চাঁদমালা থেকে শুরু করে পুজোর রকমারি সামগ্রী— কারখানায় কারখানায় এখন নাওয়া-খাওয়ার জো নেই।
তবে কাজের এই বিপুল ব্যস্ততার মাঝেও শিল্পীদের কপালে দুশ্চিন্তার গভীর ভাঁজ। কাঁচামালের দাম গত ছয় মাসে প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেলেও, সেই অনুপাতে উৎপাদিত পণ্যের দাম না বাড়ায় চরম আর্থিক সংকটের মুখে পড়েছেন নবদ্বীপের এই কুটির শিল্পীরা। শারদীয় উৎসবের মরশুমে চাহিদা মেটাতে নবদ্বীপ শহরের কপালীপাড়া, পাকাটোল, এবং প্রাচীন মায়াপুর-সহ বিভিন্ন এলাকার পেতল কারখানাগুলিতে এখন প্রহর গুনছে শিল্পীদের ব্যস্ত হাত। দিনভর চলছে প্রতিমার হরেক রকমের অস্ত্র প্রস্তুত, পালিশ ও বিক্রির কাজ। ছোট-বড় অগুনতি মণ্ডপ আর ঘরের পুজোর অর্ডারের জোগান দিতে হিমশিম খাচ্ছেন কারিগররা।
কিন্তু উৎপাদনের এই রমরমার আড়ালেই জমাট বাঁধছে অনিশ্চয়তার মেঘ। শিল্পী ও কারখানার মালিকদের মূল চিন্তার কারণ পেতলের কাঁচামালের অনিয়ন্ত্রিত মূল্যবৃদ্ধি। নবদ্বীপের কপালীপাড়ার প্রখ্যাত পেতল সামগ্রী প্রস্তুতকারক সুদীপ ঘোষ আক্ষেপের সুর নিয়ে জানান, “মাত্র ছ’মাস আগেই পেতলের দাম ছিল কেজিপ্রতি ৭০০ টাকার কিছু বেশি। অথচ বর্তমানে সেই দাম লাফিয়ে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১,৩০০ টাকারও উপরে! অর্থাৎ কাঁচামালের পেছনে খরচ এক ধাক্কায় প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গিয়েছে।”তিনি আরও জানান, কাঁচামালের অস্বাভাবিক দর বাড়লেও তৈরি সামগ্রীর বিক্রয়মূল্য সেই অনুপাতে বাড়ানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
ফলে এক চরম অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়েছেন তাঁরা।দাম বাড়ালেই বিমুখ ক্রেতা, লাভের হিসেব মেলাতে কালঘামগত বছরের হিসেব টেনে সুদীপবাবু তুলে ধরেন শিল্পীদের আসল পরিস্থিতির কথা। তাঁর কথায়, “গত বছর তিন ফুটের দুর্গাপ্রতিমার একটি পূর্ণাঙ্গ পেতলের অস্ত্রের সেট আমরা বিক্রি করেছিলাম ২,৬০০ থেকে ২,৭০০ টাকার মধ্যে। কাঁচামালের বর্তমান ঊর্ধ্বমুখী বাজার দর অনুযায়ী এবার ওই সেটের দাম অনেক বেশি হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু বাস্তবে আমরা প্রায় ৩,৫০০ টাকায় বিক্রি করতে গেলেই অনেক ক্রেতা দাম বেশি বলে অসন্তোষ প্রকাশ করছেন।
ফলে বাড়তি খরচের পুরোটাই আমাদের ঘাড়েই চেপে বসছে।”অন্যান্য ব্যবসায়ীদের বক্তব্য, কাঁচামাল কেনার অতিরিক্ত অর্থ ছাড়াও রয়েছে দক্ষ কারিগরদের মজুরি ও জ্বালানি খরচ। কিন্তু বাজারের আর্থিক স্থবিরতার কারণে উৎপাদিত সামগ্রীর দাম বেশি হাঁকা যাচ্ছে না। বিক্রিবাটা হয়তো মন্দ হচ্ছে না, তবে পুজোর শেষে হিসাবের খাতায় লাভের অঙ্ক থাকবে নাকি শুধুই লোকসান, তা নিয়েই কাটছে দুশ্চিন্তার দিন।ঐতিহ্যবাহী শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন ,মণ্ডপে মণ্ডপে যখন মৃন্ময়ী মা দুর্গার দশ হাতে শোভা পাবে নবদ্বীপের কারিগরদের তৈরি চকচকে পেতলের তলোয়ার, ত্রিশূল, খড়্গ আর চক্র—তখন আলোকোজ্জ্বল উৎসবের আড়ালেই ঢাকা পড়ে থাকবে কারিগরদের ঘাম আর না-পাওয়ার গল্প। কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধির এই প্রবল ধাক্কা সামলে ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত শত শত কারিগরের মুখে শেষ পর্যন্ত কতটা হাসি ফোটে, এখন সেটাই দেখার।















