রাজ্যে পেট্রল রয়েছে। (রান্নার) গ্যাসও আছে। ডিএম, পুলিশ অফিসারদের বদলে দিয়ে বাংলার হলদিয়ায় উৎপাদিত গ্যাস বাইরে পাঠানো হোক, তা চাই না।’— শুক্রবার অন্ডাল যাওয়ার পথে কলকাতা বিমানবন্দরে দাঁড়িয়ে ঠিক এই ভাষাতেই কেন্দ্রকে চরম হুঁশিয়ারি দিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। রাজ্যে উৎপাদিত রান্নার গ্যাস যাতে কোনোভাবেই সীমানার বাইরে না যায়, তা নিয়ে কার্যত রণংদেহি মেজাজে ধরা দিলেন তৃণমূল নেত্রী। তাঁর সাফ কথা, ভোটের ডিউটিতে আসা লক্ষ লক্ষ বহিরাগত জওয়ানের জোগান দিতে গিয়ে যেন বাংলার সাধারণ মানুষের হেঁশেল খালি না হয়। শুক্রবার নির্ধারিত সূচি মেনেই বিমানে চেপে অন্ডালের উদ্দেশে রওনা দেন মুখ্যমন্ত্রী। তবে উড়ানে চাপার আগে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে একগুচ্ছ ক্ষোভ উগরে দেন তিনি। এলপিজি বা রান্নার গ্যাসের জোগান নিয়ে বর্তমানে দেশে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তার প্রেক্ষিতেই মমতার এই আগাম সতর্কতা। তাঁর আশঙ্কা, নির্বাচনের আবহে জেলাশাসক ও পুলিশ কর্তাদের রদবদল করে রাজ্যকে অন্ধকারে রেখে গ্যাস পাচার করা হতে পারে।
মুখ্যমন্ত্রী এদিন স্পষ্ট জানান, ‘১০ লক্ষ লোক বাইরে থেকে নির্বাচনের সময়ে ডিউটি করতে আসবেন। তাঁদের গ্যাস দিতে গিয়ে বাংলার লোকের যাতে গ্যাসের সমস্যা না হয়!’ রাজ্যের মানুষের জন্য কেরোসিনের বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে জানিয়েও তিনি বলেন, ‘কেরোসিন আমরা (বরাদ্দ) বাড়িয়েছি কিছুটা। লোকজন কেরোসিন রেশনের মাধ্যমে পাবেন। কিন্তু বেশির ভাগ মানুষ এখন গ্যাসে রান্না করেন।’ পেট্রোলিয়াম পণ্যের শুল্ক হ্রাস নিয়েও মোদী সরকারকে একহাত নিয়েছেন মমতা। কেন্দ্রের এই সিদ্ধান্তকে তিনি ‘শাড়ির দোকানের সেল’-এর সঙ্গে তুলনা করে কটাক্ষ করেন। মমতা বলেন, ‘আগে তো কমুক। বাড়িয়েছে কত? শাড়ির দোকানের মতো। এটা অনেকটা ১,০০০ টাকা দাম বাড়িয়ে শাড়িতে ৪০০ টাকা ছাড় দেওয়ার মতো। শুল্ক কমানো মানে কত দাম কমবে? শুল্ক কত শতাংশ? আমি চাই, লোকে পাক। লোকের অসুবিধা যাতে না হয়।’ যদিও কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হরদীপ সিংহ পুরী দাবি করেছেন, আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা সত্ত্বেও দেশবাসীকে স্বস্তি দিতেই সরকার এই আর্থিক বোঝা নিজের কাঁধে নিয়েছে। কিন্তু মমতা এই যুক্তি মানতে নারাজ।
শুধু গ্যাস বা জ্বালানি নয়, মুখ্যমন্ত্রীর আক্রমণের তির ছিল ভোটার তালিকার অসঙ্গতির দিকেও। অতিরিক্ত ভোটার তালিকা বা সাপ্লিমেন্টারি লিস্ট নিয়ে নির্বাচন কমিশন ও বিজেপিকে একযোগে বিঁধেছেন তিনি। মমতার বিস্ফোরক অভিযোগ, ‘সুপ্রিম কোর্ট বলেছিল অতিরিক্ত ভোটার তালিকা বার করতে। প্রথম সাপ্লিমেন্টারি তালিকা আসেনি এখনও। এর থেকে বেশি গণতন্ত্রের হত্যা হতে পারে না! দুর্ভাগ্যজনক।’ তিনি আরও দাবি করেন, বেছে বেছে লক্ষ লক্ষ নাম কেটে বাদ দেওয়া হয়েছে। তাঁর কথায়, ‘আমি শুনেছি ৫০ শতাংশ নাম কেটে কেটে বাদ দেওয়া হয়েছে। দেখে দেখে বাদ দেওয়া হয়েছে। সুতির একটা বুথে ৪০০ নাম বাদ। সেখানে ভোটারই ৫০০। বসিরহাটে একটা বুথে ৬০০ ভোটার। ৪০০ বাদ।’ কমিশনকে ‘সুপার হিটলার’ কটাক্ষ করে তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘বিজেপির ভ্যানিশের ওয়াশিং মেশিন। এরা গণতন্ত্রকে ভ্যানিশ করে দিয়েছে। মানুষের অধিকার ভ্যানিশ করে দিয়েছে। ওদের দেখলে আমার ঘৃণা হয়। লজ্জা হয়।’
শুক্রবার মেজাজে থাকলেও বৃহস্পতিবারের আকাশ-বিভ্রাট নিয়ে পাইলটদের দরাজ প্রশংসা করেছেন মমতা। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় প্রায় দেড় ঘণ্টা আকাশে চক্কর কাটার পর নিরাপদে অবতরণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘পাইলট খুব ভাল ছিল। সব চেষ্টা করেছে। আমাদের জীবন বাঁচিয়েছে।’ উল্লেখ্য, বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টা ১৯ মিনিটে বিমানটি কলকাতা বিমানবন্দরে নামতে পেরেছিল। শুক্রবার কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি না থাকলেও শনিবার মমতার তিনটি জনসভা রয়েছে। সড়কপথে যাওয়ার জল্পনা থাকলেও এদিনও তিনি আকাশপথকেই বেছে নেন। ভাষণের শেষে রামনবমীর অনুষঙ্গ টেনে বিজেপিকে হুঁশিয়ারি দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘এ সব কে করেছে, কারা করেছে? এক দিন না এক দিন মানুষ কৈফিয়ত চাইবে। বুকের পাটা থাকলে বলব তালিকা বার করুন। মানুষকে জানতে দিন, কার নাম আছে, কার নেই। ধর্মের কল বাতাসে নড়ে, আজ রামনবমীতে বলে গেলাম।’
এদিন সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী মোদী একটি জরুরি বৈঠক ডেকেছেন যেখানে বাংলা-সহ পাঁচ রাজ্যের মুখ্যসচিবদের থাকার কথা। সেখানে রান্নার গ্যাসের এই সম্ভাব্য সঙ্কট নিয়ে কী সিদ্ধান্ত হয়, সেদিকেই তাকিয়ে রাজনৈতিক মহল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই আগাম ‘আক্রমণাত্মক রক্ষাকবচ’ মোদী সরকারকে চাপে রাখবে বলেই মনে করা হচ্ছিল । অন্যদিকে, ভোটার তালিকা নিয়ে যে দুর্নীতির অভিযোগ তিনি তুলেছেন, তার রেশ কতদূর গড়ায় সেটাই এখন দেখার। নির্বাচনের মুখে মমতার এই প্রতিটি শব্দ যেন এক একটি রাজনৈতিক ব্রহ্মাস্ত্র। তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন, বাংলার স্বার্থে তিনি কোনো আপস করবেন না। বাংলার সম্পদ বাংলার মানুষের জন্যই মজুত রাখতে হবে, এটাই তাঁর প্রধান দাবি। আগামিকাল তিনটি জনসভায় তিনি আরও কী কী বিস্ফোরক মন্তব্য করেন, তার অপেক্ষায় রাজ্যবাসী। ছবি সংগৃহিত ।














