প্রাক্তন সেনাপ্রধান এমএম নারাভানের অপ্রকাশিত স্মৃতিকথা থেকে উদ্ধৃতি দিতে গিয়ে লোকসভায় প্রবল বিতর্কের মুখে পড়লেন বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী। সোমবার সংসদের নিম্নকক্ষে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ জ্ঞাপন প্রস্তাব নিয়ে আলোচনার সময় এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রীতিমতো সংঘাতের আবহ তৈরি হয়। লাদাখ সীমান্তে চিনা আগ্রাসন নিয়ে সরব হতে গিয়েই বিপাকে পড়েন রাহুল। প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রাজনাথ সিং এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ একযোগে রাহুলের এই পদক্ষেপের তীব্র বিরোধিতা করেন। এমনকি সংসদের নিয়মের বাইরে গিয়ে কাজ করছেন বলে বিরোধী দলনেতাকে মৃদু ভর্ৎসনা করেন খোদ লোকসভার অধ্যক্ষ ওম বিড়লা।
বিতর্কের সূত্রপাত হয় যখন রাহুল গান্ধী লাদাখ পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের সমালোচনা শুরু করেন। ২০২০ সালের গালওয়ান সংঘর্ষের প্রসঙ্গ টেনে তিনি দাবি করেন, ভারত লাগাতার চিনের কাছে জমি হারাচ্ছে। অথচ সরকার এ বিষয়ে নীরব। নিজের বক্তব্যের স্বপক্ষে প্রমাণ দিতে তিনি প্রাক্তন সেনাপ্রধান জেনারেল নারাভানের একটি স্মৃতিকথার পাণ্ডুলিপি বা প্রবন্ধ থেকে কিছু অংশ পাঠ করতে চান। রাহুল বলেন, ‘জেনারেল নারাভানে বলছেন, কৈলাশ রেঞ্জে চিনা সেনা ভারতের অবস্থানের ১০০ মিটারের মধ্যে চলে এসেছিল…।’ বিরোধী দলনেতা এই পর্যন্ত বলতেই আসরে নামেন রাজনাথ সিং। তিনি কড়া সুরে প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, যে বই এখনও জনসমক্ষে প্রকাশিতই হয়নি, তার উদ্ধৃতি সংসদে দেওয়া যায় না।
বিজেপির পক্ষ থেকে অভিযোগ তোলা হয় যে, রাহুল আসলে একটি ম্যাগাজিনের নিবন্ধকে বইয়ের উদ্ধৃতি বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। রাহুল গান্ধীর হাতে সেই সময় ‘দ্য ক্যারাভান’ ম্যাগাজিনের ফেব্রুয়ারি সংখ্যার একটি কপি ছিল। বিজেপি সাংসদ তেজস্বী সূর্যের দেশপ্রেম সংক্রান্ত মন্তব্যের জবাব দিতে গিয়েই রাহুল এই প্রসঙ্গ উত্থাপন করেন। তিনি বলেন, ‘ওখানে আমার এক তরুণ সহকর্মী কংগ্রেস পার্টির বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ তুলেছেন। আমি এই বিষয়টি উত্থাপন করতে যাচ্ছিলাম না, কিন্তু যেহেতু তিনি আমাদের দেশপ্রেম, ভারতীয় সংস্কৃতি সম্পর্কে আমাদের ভাবনা-চিন্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, তাই আমি কিছু পড়ে শোনাতে চাই। আর এটি সেনাপ্রধান নারাভানের স্মৃতিকথা থেকে নেওয়া। আমি চাই আপনারা মনোযোগ দিয়ে শুনুন। তাহলেই আপনারা ঠিক বুঝতে পারবেন কে দেশপ্রেমিক আর কে নয়।’
রাহুলের এই অনড় মনোভাব দেখে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। রাজনাথ সিং বারংবার প্রশ্ন তোলেন, বইটি কি আদৌ বাজারে এসেছে? অপ্রকাশিত কোনো গ্রন্থের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি রাহুলকে থামিয়ে দেন। জবাবে রাহুল দাবি করেন, তাঁর কাছে থাকা উৎসটি শতভাগ বিশ্বাসযোগ্য। কিন্তু স্পিকার ওম বিড়লা রাজনাথের বক্তব্যকেই সমর্থন করেন। তিনি বলেন, ‘এই সদনে কোনওভাবে কোনও সংবাদ বা বই নিয়ে আলোচনা হয় না। আর যে বই প্রকাশিত হয়নি সেটা নিয়ে বলার অনুমতি দেওয়া যায় না।’ স্পিকারের এই কঠোর অবস্থানের ফলে লাদাখ ইস্যুতে রাহুল যে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিতে চেয়েছিলেন, তা শেষ পর্যন্ত আর এগোয়নি। ২০১৯ থেকে ২০২২ পর্যন্ত সেনাপ্রধানের দায়িত্ব সামলানো নারাভানের লেখা নিয়ে তৈরি হওয়া এই বিতর্ক শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক টানাপড়েনে রূপ নেয়।














