রাজ্যে এসআইআর আতঙ্কে মৃত্যু মিছিল অব্যাহত। ভোটার তালিকা সংশোধনের বিশেষ প্রক্রিয়া বা ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (এসআইআর) ঘিরে তৈরি হওয়া আতঙ্কে সোমবারও রাজ্যে দুই বৃদ্ধের মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ। পুরুলিয়ায় ট্রেনের সামনে ঝাঁপ দিয়ে আত্মঘাতী হয়েছেন ৮২ বছরের এক বৃদ্ধ। অন্য দিকে, হাওড়ার আমতায় শুনানির নোটিস পাওয়ার পর হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে আরও এক প্রবীণ ভোটারের। এই জোড়া মৃত্যুর ঘটনায় কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে সরব হয়েছে শাসকদল তৃণমূল। যদিও সব অভিযোগ উড়িয়ে পাল্টা রাজনীতির অভিযোগ তুলেছে বিজেপি।
উত্তপ্ত পরিস্থিতির মাঝেই সোমবার বিকেলে বিজ্ঞপ্তি জারি করে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ৮৫ বছর বা তার বেশি বয়সি এবং অসুস্থদের আর শুনানিকেন্দ্রে আসতে হবে না। পুরুলিয়ার চৌতলার বাসিন্দা দুর্যন মাঝি সোমবার বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন এসআইআর কেন্দ্রে শুনানির জন্য। ৮২ বছরের এই বৃদ্ধ কেন্দ্রে যাওয়ার জন্য অনেক চেষ্টা করেও কোনও টোটো বা যানবাহন পাননি বলে জানিয়েছে তাঁর পরিবার। সঠিক সময়ে পৌঁছতে না পারার উদ্বেগ এবং শুনানির আতঙ্ক সইতে না পেরে রেললাইনে ঝাঁপ দিয়ে তিনি আত্মঘাতী হন বলে অভিযোগ পরিবারের।
একই চিত্র ধরা পড়েছে হাওড়ার আমতার সাবসিট এলাকায়। সেখানে ৭০ বছর বয়সি শেখ জামাত আলির বাড়িতে বিএলও এসে শুনানির নোটিস দিয়ে যান। ভোটার তালিকায় নাম না থাকা এবং দেশ ছাড়ার আশঙ্কায় প্রবল দুশ্চিন্তা শুরু করেন তিনি। সোমবার ভোর রাতে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়। জামাতের পরিবারের দাবি, পঞ্চাশ বছর ভোট দেওয়ার পরেও কেন এই হয়রানি, সেই আতঙ্কেই প্রাণ গিয়েছে বৃদ্ধের। রাজ্যে এসআইআর প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর থেকেই সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি দানা বেঁধেছে। বিশেষ করে প্রবীণ ও দিনমজুরদের মধ্যে ঘরছাড়া হওয়ার ভীতি কাজ করছে বলে দাবি শাসকদলের। সোমবার তৃণমূলের পাঁচ সদস্যের এক প্রতিনিধিদল মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের (সিইও) দফতরে গিয়ে স্মারকলিপি জমা দেন।
পার্থ ভৌমিক, শশী পাঁজা ও বিরবাহা হাঁসদাদের অভিযোগ ছিল, অসুস্থ ও প্রবীণদের অ্যাম্বুল্যান্সে করে শুনানিকেন্দ্রে নিয়ে আসা হচ্ছে, যা চূড়ান্ত অমানবিক। এই চাপানউতরের মধ্যেই নড়েচড়ে বসে কমিশন। নতুন বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ৮৫ ঊর্ধ্ব ভোটার, অসুস্থ এবং বিশেষ ভাবে সক্ষমদের বাড়িতে গিয়েই বিএলও-রা শুনানির কাজ সারবেন। যদি কেউ ভুলবশত নোটিস পান, তবে সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদেরই উদ্যোগী হয়ে তাঁর বাড়ি যেতে হবে। কমিশনের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েও সুর চড়িয়েছেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।
তিনি সমাজমাধ্যমে লিখেছেন, ষাটোর্ধ্ব এবং কো-মর্বিডিটি থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি নেওয়া উচিত। অন্যদিকে, বিজেপি নেতৃত্বের দাবি, এসআইআর একটি রুটিন প্রক্রিয়া। যে কোনও স্বাভাবিক বা আকস্মিক মৃত্যুকে তৃণমূল রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করছে বলে তাঁদের অভিযোগ। কমিশন সূত্রে জানানো হয়েছে, এখন থেকে বিএলও-দের সপ্তাহে তিন দিন এবং ছুটির দিনে বুথে বসতে হবে যাতে ফর্ম জমা দেওয়ার কাজ সহজ হয়।
শুনানিকেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিতে রাজ্য পুলিশের ডিজি এবং কলকাতার পুলিশ কমিশনারকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গত ১ নভেম্বর থেকে শুরু হওয়া এই প্রক্রিয়ায় এখনও পর্যন্ত বহু মানুষের মৃত্যুর খবর সামনে আসায় রাজ্য রাজনীতিতে তোলপাড় চলছে। ভোটার তালিকা থেকে নাম কাটার চক্রান্ত রুখতে সাধারণ মানুষকে সচেতন হওয়ার ডাক দিয়েছে রাজনৈতিক দলগুলি। কমিশন আশ্বস্ত করেছে যে, প্রকৃত ভোটারদের ভয়ের কোনও কারণ নেই। তবু মাঠের বাস্তব চিত্র বলছে, গ্রামগঞ্জে এখনও এসআইআর শুনানির চিঠি মানেই এক অজানা আশঙ্কার ছায়া। ফাইল ফটো।












