ভোটার তালিকা সংশোধনের মেগা লড়াইতে এবার নয়া মোড়। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে পিছু হটে নয়, বরং কোমর বেঁধে নামল নবান্ন। সোমবার শীর্ষ আদালতে গুরুত্বপূর্ণ শুনানির ঠিক ৪৮ ঘণ্টা আগে নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দিয়ে রাজ্য জানিয়ে দিল, বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) কাজে তারা মোট ৮,৫০৫ জন গ্রুপ-বি আধিকারিক দিতে সক্ষম। কমিশনের আনা ‘অসহযোগিতা’র অভিযোগ কার্যত নস্যাৎ করে দিয়ে নবান্ন স্পষ্ট করল, প্রয়োজনে বাংলার ভূমিপুত্র অফিসারদের দিয়েই সম্পন্ন হবে সংশোধনের কাজ। সোমবার সুপ্রিম কোর্টে ফের সওয়াল করতে পারেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্বয়ং বলে জল্পনা চলছে সর্বত্র।তার আগেই এই সংখ্যাতত্ত্ব পেশ করে রাজ্য সরকার নিজেদের অবস্থান মজবুত করল বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
গত বুধবার সুপ্রিম কোর্টের এজলাসে এক নজিরবিহীন বাদানুবাদ দেখেছিল দেশ। রাজ্যের হয়ে নিজে সওয়াল করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। সেখানে কমিশনের আইনজীবী পাল্টা দাবি তোলেন যে, পশ্চিমবঙ্গ সরকার পর্যাপ্ত আধিকারিক দিচ্ছে না বলেই ভিন রাজ্য থেকে অফিসার ভাড়া করতে হচ্ছে। এর পরেই প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি বিপুল মনুভাই পাঞ্চোলির বেঞ্চ নবান্নকে নির্দেশ দিয়েছিল দ্রুত আধিকারিকদের তালিকা জমা দিতে। সেই নির্দেশ পালন করেই শনিবার পিটিআই মারফত জানা গেল, নবান্ন ৮,৫০৫ জনের বিশাল বাহিনী প্রস্তুত রেখেছে। কমিশনের সেই পুরনো অভিযোগ যে রাজ্য মাত্র ৮০ জন ‘গ্রেড-২’ অফিসার দিয়েছে, তাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এই নতুন তালিকা জমা পড়ল।
ঘটনার সূত্রপাত ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়ায় সাধারণ মানুষের হয়রানি নিয়ে। মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ ছিল, নামের বানানের ছোটখাটো ভুল বা পদবি পরিবর্তনের মতো তুচ্ছ কারণে হাজার হাজার সাধারণ মানুষকে শুনানিতে ডেকে হেনস্থা করা হচ্ছে। তিনি সরব হয়েছিলেন ভাষাগত সমস্যা নিয়েও। তাঁর যুক্তি ছিল, ভিন রাজ্যের আধিকারিকরা বাংলা না বোঝায় বানান বিভ্রাট বাড়ছে। আদালতও এই যুক্তিতে সিলমোহর দিয়ে জানিয়েছিল, “বানানের ছোটখাটো ভুলের জন্য কারও নাম যাতে তালিকা থেকে বাদ না-যায়, তা কমিশনকে নিশ্চিত করতে হবে।” আর এই জট কাটাতে আদালত নবান্নকে এমন আধিকারিকদের তালিকা দিতে বলেছিল যারা বাংলা ভাষায় সাবলীল।
শনিবারের এই চিঠি আসলে সোমবারের শুনানির আগে নবান্নের মোক্ষম হাতিয়ার। এর আগে কমিশন আদালতে নালিশ করেছিল যে, রাজ্য সরকার এসআইআরের কাজে কেবল অঙ্গনওয়ারি কর্মী বা নিচুতলার কর্মীদের পাঠাচ্ছে। কিন্তু এবার ৮,৫০৫ জন গ্রুপ-বি পদমর্যাদার আধিকারিকের নাম সামনে এনে নবান্ন বুঝিয়ে দিল, পেশাদারিত্বে খামতি রাখতে নারাজ তারা। এর ফলে ভিন রাজ্য থেকে অফিসার আনার কমিশনের যুক্তি ধোপে টিকবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। অন্যদিকে, আদালতও কমিশনের উদ্দেশ্যে কড়া বার্তা দিয়ে রেখেছে। শুনানির নোটিস পাঠানোর ক্ষেত্রে আধিকারিকদের আরও বেশি “সংবেদনশীল” হওয়ার নির্দেশ দিয়েছে শীর্ষ আদালত।
গত ২৬ নভেম্বর থেকে শুরু হওয়া এই এসআইআর প্রক্রিয়া এখন অন্তিম লগ্নে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ৭ ফেব্রুয়ারির মধ্যে শুনানি শেষ করে ১৪ ফেব্রুয়ারি চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের কথা ছিল। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন। রাজ্যের বহু জায়গায় এখনও শুনানি প্রক্রিয়া শেষ হয়নি। কমিশনের অন্দরের খবর, নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা কার্যত অসম্ভব। তাই চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের দিনক্ষণ পিছিয়ে যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সোমবার সুপ্রিম কোর্ট এই সময়সীমা নিয়ে কী নির্দেশ দেয়, এখন সেটাই দেখার।
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় গতবার অভিযোগ করেছিলেন যে, “নামের বানানের ভুলের জন্য কিংবা পদবি পরিবর্তনের জন্য অনেক ভোটারকে এসআইআরের শুনানিতে ডাকা হয়েছে। এতে সাধারণ মানুষের হেনস্থা হচ্ছে।” এই বক্তব্যকে গুরুত্ব দিয়ে আদালত জানিয়েছিল যে, এসআইআরের কাজে বাংলায় সাবলীল আধিকারিকদের নিয়োগ করলেই এই বিভ্রান্তি মিটবে। নবান্নের পাঠানো এই ৮,৫০৫ জনের বাহিনী মূলত সেই ভাষাগত ও প্রশাসনিক শূন্যস্থান পূরণ করতেই তৈরি।
সোমবারের শুনানিতে শুধু যে আধিকারিকদের সংখ্যা নিয়ে আলোচনা হবে তা নয়, বরং ভোটারদের অধিকার এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়েও কড়া প্রশ্নের মুখে পড়তে হতে পারে কমিশনকে। রাজ্য এবং মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিককে ইতিমধ্যে নোটিস জারি করেছে আদালত। সোমবারের মধ্যে তাঁদের লিখিত জবাব পেশ করার কথা। রাজ্য আগেভাগেই তথ্য দিয়ে রাখায় কমিশনের আইনজীবীদের কাছে পাল্টা যুক্তি সাজানো কঠিন হতে পারে বলে ধারণা আইনজীবীদের একাংশের। সব মিলিয়ে ১৪ ফেব্রুয়ারির ক্যালেন্ডারে বড়সড় রদবদল আসতে চলেছে। আপাতত সোমবারের সুপ্রিম শুনানিই ঠিক করে দেবে বাংলার ভোটার তালিকার ভবিষ্যৎ কোন পথে। নবান্ন তাদের গুটি সাজিয়ে ফেলেছে, এবার বল দিল্লির কোর্টে। কমিশনারের পাঠানো সময়ের আবেদন মঞ্জুর হয় না কি নতুন কোনও কড়া দাওয়াই দেয় সুপ্রিম কোর্ট, সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে গোটা রাজ্য।













