নির্বাচনী বুথের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার গুরুদায়িত্ব কার? নির্বাচন কমিশনের নাকি আদালতের? আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের আগে এই প্রশ্নেই এখন সরগরম কলকাতা হাইকোর্ট। বুথের নিরাপত্তা সংক্রান্ত একটি জনস্বার্থ মামলায় কমিশনের হলফনামা তলব করে কার্যত নজিরবিহীন কড়া অবস্থান নিল প্রধান বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চ। কমিশনের দায়বদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে প্রধান বিচারপতি সুজয় পাল সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কমিশনের কাজ, আদালতের নয়। রাজ্যজুড়ে প্রায় ৮৩ হাজার বুথের নিরাপত্তা নিয়ে তৈরি হওয়া এই আইনি টানাপোড়েন এখন রাজ্য রাজনীতির অলিন্দে নতুন চর্চার জন্ম দিয়েছে।
বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের দায়ের করা জনস্বার্থ মামলার শুনানিতে বৃহস্পতিবার কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি সুজয় পাল এবং বিচারপতি পার্থ সারথি সেনের ডিভিশন বেঞ্চ কমিশনের আইনজীবীর উদ্দেশে সরাসরি প্রশ্ন ছোড়ে। প্রধান বিচারপতি বলেন, নির্বাচন কমিশন এই ব্যাপারে রাজ্যকে পদক্ষেপ করতে নির্দেশ না-দিয়ে কেন আদালতের ঘাড়ে দায় ঠেলছে ? কমিশনের স্বশাসিত ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কেন তারা এই বিষয়ে আদালতের হস্তক্ষেপ চাইছে, তা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছে বেঞ্চ। বিচারপতির স্পষ্ট পর্যবেক্ষণ, এটা নির্বাচন কমিশনের কাজ ৷ তারা নির্দেশ দিতে পারে ৷ আদালতের উপর কেন দায় চাপানো হচ্ছে ?
আদালতে শুনানির সময় এক চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে আসে। নির্বাচন কমিশনের আইনজীবী জানান, বুথের নিরাপত্তা সংক্রান্ত পরিকাঠামো খতিয়ে দেখার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল ম্যাকিনটোশ বার্ন কোম্পানিকে। কিন্তু সেই সরকারি সংস্থা রাজ্যের অর্থ দপ্তরের সঙ্গে আলোচনার পর মাঝপথেই কাজ ছেড়ে দিয়েছে। কমিশনের দাবি, কাজটির ৪০ শতাংশ শেষ হওয়ার পর সংস্থাটি অব্যাহতি নেওয়ায় সমস্যা তৈরি হয়েছে। কমিশনের মতে, এখন এই দায়িত্ব পালনের দায় সম্পূর্ণভাবে রাজ্য সরকারের। যদিও মামলার আবেদনকারীর আইনজীবীর পাল্টা সওয়াল, রাজ্য সরকার অন্তত স্পষ্ট করে জানাক বাস্তব পরিস্থিতি ঠিক কী। প্রয়োজনে আদালতই বুথের ন্যূনতম নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নির্দেশ দিক।
উল্লেখ্য, সামনেই বিধানসভা নির্বাচন। তার প্রস্তুতি হিসেবে গত ১৩ জানুয়ারি বিজেপি রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য ব্যক্তিগতভাবে আদালতে উপস্থিত হয়ে রাজ্যের ৮৩ হাজার বুথের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার আবেদন জানিয়েছিলেন। তাঁর মূল অভিযোগ ছিল, নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা সংস্থা ছ’মাস আগেই কাজ ছেড়ে দিলেও কমিশন বা রাজ্য সরকার নতুন কোনও ব্যবস্থা নেয়নি। শমীক ভট্টাচার্যের আর্জিতে বলা হয়েছিল, রাজ্য যদি এই বিশাল সংখ্যক বুথের নিরাপত্তা দিতে অপারগ হয়, তবে আদালত যেন কেন্দ্রকে দায়িত্ব দেওয়ার নির্দেশ দেয়।
আদালত অবশ্য এখনই কোনও চূড়ান্ত রায় দেয়নি। প্রধান বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চ নির্দেশ দিয়েছে, আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে নির্বাচন কমিশনকে হলফনামা দিয়ে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করতে হবে। একই সঙ্গে আদালত এও স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, এই পর্যায়ে তারা কোনও পক্ষের বিরুদ্ধেই কোনও নেতিবাচক মন্তব্য করতে চায় না। এখন প্রশ্ন উঠছে, কমিশনের হাতে যে অগাধ সাংবিধানিক ক্ষমতা রয়েছে, তা প্রয়োগ না করে কেন তারা আইনি রক্ষাকবচ খুঁজছে? আগামী সপ্তাহে কমিশনের হলফনামায় এই জট কাটে কি না, সেটাই এখন দেখার।















