পুজোর ক’দিন ঘড়ির কাঁটার হিসাব ভুলে এমন রুটিনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েন অনেকেই। কিন্তু আনন্দের এই দৌড়ে শরীরের উপর কতটা চাপ পড়ছে, খেয়াল থাকে কি?
পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব, একটানা হাঁটাহাঁটি, কম জল পান এবং অনিয়মিত খাওয়াদাওয়ার জেরে দেখা দিতে পারে একাধিক শারীরিক সমস্যা। আগে থেকে হৃদ্রোগ, ডায়াবেটিস বা হাঁটুর সমস্যা থাকলে ঝুঁকি আরও বেশি। তাই পুজোর আনন্দ উপভোগ করতে হলে আগে থেকেই সতর্ক হওয়া জরুরি।
একটানা হেঁটে পায়ে সমস্যা
সারা বছর নিয়মিত হাঁটার অভ্যাস নেই, অথচ পুজোয় এক রাতেই কয়েক কিলোমিটার হেঁটে ফেলছেন! এর ফলে পায়ের পাতা, গোড়ালি, হাঁটু ও কোমরে ব্যথা হতে পারে। দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলে পা ফুলে যাওয়া, পেশিতে টান ধরা বা নতুন জুতোর ঘষায় ফোসকা পড়ার আশঙ্কাও থাকে।
কী করবেন?
আরামদায়ক, পায়ের মাপের সঙ্গে মানানসই জুতো পরুন। হাঁটার মাঝে বিশ্রাম নিন। পায়ে ব্যথা শুরু হলে জোর করে হাঁটবেন না। হাঁটু বা কোমরের পুরনো সমস্যা থাকলে নিজের শারীরিক সক্ষমতা বুঝে মণ্ডপ ঘোরার পরিকল্পনা করুন।
জল পান কম করলেই বিপদ
ভিড়ের মধ্যে দীর্ঘক্ষণ হাঁটা, গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় ঘাম হওয়া এবং জল পানের কথা ভুলে যাওয়ার ফলে শরীরে জলের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। মাথা ঘোরা, মাথাব্যথা, দুর্বলতা, অতিরিক্ত ক্লান্তি বা প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া তার লক্ষণ হতে পারে।
কী করবেন?
সঙ্গে জলের বোতল রাখুন এবং নিয়মিত জল পান করুন। তেষ্টা পাওয়ার অপেক্ষা করবেন না। মাথা ঘুরলে বা দুর্বল লাগলে ভিড় থেকে বেরিয়ে বিশ্রাম নিন। অস্বস্তি না কমলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
রাত জাগার মাশুল ঘুমের ঘাটতি
সারারাত ঠাকুর দেখে সকালে বাড়ি ফিরে আবার কাজে বেরিয়ে পড়া বা পরের রাতেও একই রুটিন চালিয়ে যাওয়া শরীরের স্বাভাবিক ঘুমের ছন্দ নষ্ট করতে পারে। এর ফলে মনোযোগ কমে যাওয়া, মাথা ভার লাগা, খিটখিটে মেজাজ এবং কোনও প্রতিক্রিয়ায় সমস্যা দেখা দিতে পারে। ঘুমের ঘাটতি থাকলে গাড়ি বা বাইক চালানোর সময় দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ে।
কী করবেন?
রাত জাগার পর দরকার পর্যাপ্ত ঘুম। প্রাপ্তবয়স্কদের সাধারণত দিনে ৭-৮ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন। টানা কয়েক রাত ঘুম কমিয়ে পুজো কাটানোর চেষ্টা করবেন না। ঘুম পেলে নিজে গাড়ি বা বাইক চালাবেন না।
মাঝরাতের খাওয়াদাওয়ায় অম্বল
ঠাকুর দেখতে গিয়ে অনেকেই দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকেন। আবার মাঝরাতে একসঙ্গে বেশি ভাজাভুজি, ঝাল খাবার, রোল বা বিরিয়ানি খেয়ে নেন। এই অনিয়মে অম্বল, বুকজ্বালা, পেট ফাঁপা ও বমি বমি ভাব দেখা দিতে পারে। খাওয়ার পরপরই শুয়ে পড়লে অ্যাসিড রিফ্লাক্সের সমস্যাও বাড়তে পারে।
কী করবেন?
বেরনোর আগে হালকা, পুষ্টিকর খাবার খান। বাইরে খেলে পরিচ্ছন্ন জায়গা থেকে খাবার কিনুন। একসঙ্গে অতিরিক্ত না খেয়ে পরিমাণ বুঝে খান। যাঁদের অম্বলের সমস্যা রয়েছে, তাঁরা রাতে অতিরিক্ত তেল-মশলাদার খাবার এড়িয়ে চলুন।
হৃদ্রোগীরা সাবধান
দীর্ঘক্ষণ হাঁটাহাঁটি, গরমে ভিড়ের মধ্যে থাকা এবং শরীরের উপর অতিরিক্ত চাপ হৃদ্রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের সমস্যা বাড়াতে পারে। তবে সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে শুধু রাত জাগলেই হৃদ্রোগ হবে, এমন নয়। যাঁদের আগে থেকে হৃদ্রোগ, অনিয়ন্ত্রিত রক্তচাপ বা অন্য কোনও ক্রনিক ডিজিজ রয়েছে, তাঁদের চিকিৎসকের নির্দেশ মেনে ঠাকুর দেখার পরিকল্পনা করা উচিত।
কী করবেন?
নিয়মিত ওষুধ খেলে তা সঙ্গে রাখুন। নিজের শারীরিক ক্ষমতার বাইরে গিয়ে হাঁটবেন না। বুকে চাপ বা ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, অতিরিক্ত ঘাম বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিলে শুধু ক্লান্তি ভেবে এড়িয়ে যাবেন না। দ্রুত জরুরি চিকিৎসার ব্যবস্থা করুন।
ভিড়ে সংক্রমণের আশঙ্কা
বড় মণ্ডপের ভিড়ে দীর্ঘক্ষণ থাকলে শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণ ছড়ানোর ঝুঁকি বাড়তে পারে। বিশেষ করে প্রবীণ মানুষ, ছোট বাচ্চা এবং রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম এমন মানুষের বাড়তি সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
কী করবেন?
কাশি, হাঁচি বা জ্বর থাকলে ভিড় এড়িয়ে চলুন। প্রয়োজন অনুযায়ী মাস্ক ব্যবহার করুন এবং খাবার খাওয়ার আগে হাত পরিষ্কার রাখুন। শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে বেরলে তাঁদের ক্লান্তি, তেষ্টা ও শারীরিক অস্বস্তির দিকে নজর দিন।
আনন্দ থাকুক, শরীরও থাকুক সুস্থ
পুজোর আনন্দে শরীরের সংকেত উপেক্ষা করবেন না। আগে থেকে মণ্ডপ ঘোরার রুট ঠিক করুন, মাঝেমধ্যে বিশ্রাম নিন, পর্যাপ্ত জল পান করুন এবং রাত জাগার পর ঘুমের ঘাটতি পূরণ করুন। বিশেষ করে যাঁদের ক্রনিক ডিজিজ রয়েছে, তাঁরা নিজের শারীরিক ক্ষমতা বুঝেই পরিকল্পনা করুন। মনে রাখবেন, এক রাতেই সব মণ্ডপ দেখতে হবে, এমন কোনও বাধ্যবাধকতা নেই। শরীর সুস্থ থাকলে পুজোর আনন্দও উপভোগ করা যাবে নিশ্চিন্তে।














