জন্মের পর ডায়াপার থেকে মৃত্যুর শোকসভার ধূপকাঠি—সাধারণ মানুষের জীবন এখন কেবলই কেন্দ্রীয় সরকারের বেঁধে দেওয়া করের গোলকধাঁধা। মঙ্গলবার লোকসভায় কেন্দ্রীয় বাজেট ২০২৬-২৭-এর আলোচনায় অংশ নিয়ে এভাবেই মোদী সরকারকে বিঁধলেন তৃণমূল সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। বাজেটকে ‘ট্যাক্স ট্র্যাপ’ বা করের ফাঁদ বলে অভিহিত করে অভিষেক সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেন, অর্থমন্ত্রী চাইলে তথ্যের ভিত্তিতে তাঁর প্রতিটি অভিযোগের পাল্টা জবাব দিতে পারেন। প্রয়োজনে নির্মলা সীতারামন যেন তাঁর নাম নিয়েই উত্তর দেন।
সংসদে দাঁড়িয়ে ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ অভিযোগ করেন, এই দেশে মধ্যবিত্ত ও সৎ করদাতাদের পিষে ফেলা হচ্ছে আর ধনীদের জন্য রাখা হচ্ছে ‘এসকেপ রুট’। নিজের দাবির পক্ষে তাঁর যুক্তি, ‘শিশুর জন্মের পরে তাঁর ডায়াপারের ট্যাক্স, পড়াশোনা শুরু হওয়ার পরে শিক্ষা, বই, নোটবুক, পেন, পেন্সিল-সবকিছুতে ট্যাক্স, তিনি উপার্জন শুরু করলে এর উপরে ট্যাক্স, টাকা বাঁচালে এর উপরে ট্যাক্স, খরচ করলে তার উপরেও বসানো হয় ট্যাক্স, কাজে গেলে পেট্রল-ডিজেলে ট্যাক্স, অসুস্থ হলে ডাক্তার, ওষুধের উপরে ট্যাক্স, বৃদ্ধ হলে পেনশন, চিকিৎসায় ট্যাক্স, তাঁর মৃত্যুর পরে শোকসভায় ধূপ জ্বালানোর জন্যও পরিবারকে ট্যাক্স দিতে হয়।’
বাজেট বক্তৃতায় বঞ্চনার অভিযোগ তুলে অভিষেক প্রশ্ন করেন, অর্থমন্ত্রীর ৮৫ মিনিটের দীর্ঘ ভাষণে কেন একবারও বাংলার নাম নেওয়া হলো না? তাঁর দাবি, গত সাত বছরে বাংলা সাড়ে ৬ লক্ষ কোটি টাকা কর দিলেও প্রাপ্য ১ লক্ষ ৯৬ হাজার কোটি টাকা আটকে রাখা হয়েছে। ১০০ দিনের কাজ থেকে আবাস যোজনা, এমনকি পানীয় জলটুকুও এখন রাজনীতির হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে তিনি সরব হন। তাঁর স্পষ্ট বার্তা, বাংলা মেরুদণ্ড সোজা রাখবে, কারও কাছে মাথা নিচু করবে না।
২০২১ সালে কমেডিয়ান বীর দাসের সেই বিতর্কিত ‘দুই ভারত’ তত্ত্বকে টেনে এনে অভিষেক বর্তমান ভারতের এক অসহিষ্ণু ছবি তুলে ধরেন। তাঁর মতে, বীর দাস আসলে দেশের বাস্তবতাকে আয়না দেখিয়েছিলেন। অভিষেক বলেন, ‘আমি এমন এক ভারত থেকে আসি যেখানে বলা হয়, এক ভারত-শ্রেষ্ঠ ভারত। আবার সেখানেই স্রেফ মাতৃভাষাকে সন্দেহের কারণ হিসাবে দেখা হয়। বাংলা বললেই বাংলাদেশি, মাছ খেলে মোগল। এখানে জয় বাংলা বললেই অনুপ্রবেশকারী হিসাবে দেগে দেওয়া হচ্ছে।’ অনুপ্রবেশ ইস্যুতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রককে একহাত নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন, সীমান্ত নিরাপদ হলে পহেলগাও বা দিল্লির বুকে সশস্ত্র জঙ্গিরা ঢোকে কীভাবে? মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে ভারতের নীরবতা এবং নোবেলজয়ীদেরও নাগরিকত্বের অস্তিত্ব প্রমাণের দায় নিয়ে সরব হন অভিষেক। সবশেষে তাঁর হুঁশিয়ারি, মানুষই সর্বোচ্চ এবং নির্বাচনই হবে বকেয়া টাকার ‘ফাইনাল সেটেলমেন্ট’। বক্তৃতার শেষে তাঁর গলায় রণধ্বনি শোনা যায়, ‘এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না ।’ ফাইল ফটো।












