ড্রেনেজ পাইপের মতো নীল হয়ে যাওয়া শরীর, অবিশ্রান্ত বমি আর চোখের সামনে শুধুই নিকষ কালো অন্ধকার। মধ্যপ্রদেশের সাগর জেলার বান্দা ও শাহগড় ব্লকের একাধিক গ্রামে বিষ মদের ছোবলে এখনও পর্যন্ত সরকারি হিসেবে ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। তবে স্থানীয় বাসিন্দা ও বেসরকারি সূত্রের দাবি, প্রাণহানির সংখ্যা অন্তত ৩০ ছাড়িয়েছে। দেড় শতাধিক মানুষ গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন, যাঁদের মধ্যে অন্তত ৩০ জনের দৃষ্টিশক্তি চিরতরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বুন্দেলখণ্ড মেডিক্যাল কলেজের চক্ষু বিভাগে এখন শুধুই স্বজনহারার আর্তনাদ আর নিয়তিকে অভিশাপ দেওয়ার ছবি।
গত পাঁচ বছরের মধ্যে রাজ্যের অন্যতম ভয়াবহ এই বিষ মদ কাণ্ডকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রদেশের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক মহলে তীব্র আলোড়ন শুরু হয়েছে। তদন্তে নেমে পুলিশ ও আবগারি দফতরের গাফিলতির ভয়ংকর চিত্র প্রকাশ্যে এসেছে। ভুয়ো ‘সাগর গোল্ড’ লেবেল সাঁটিয়ে ভুট্টাখেতে তৈরি হয়েছিল মৃত্যুফাঁদ। পুলিশি তদন্তে জানা গিয়েছে, মূল অভিযুক্ত করণী সেনার স্থানীয় নেতা চন্দ্রভান রাজপুত ওরফে চান্দু রাজা, উত্তরপ্রদেশের আন্তঃরাজ্য মদ পাচারকারী রবি লখেরার থেকে মিথাইল অ্যালকোহল ও স্পিরিট সংগ্রহ করে শাহগড়ের তাতারোয়ারা গ্রামে নকল মদ তৈরির কারখানা খুলেছিল। এই চক্রের সঙ্গে যুক্ত ছিল এক সরকারি লাইসেন্সপ্রাপ্ত মদের দোকানের মালিক মনীশ লোধিও।
আসল মদের চেয়ে ২০-৩০ টাকা কমে মাত্র ৬০-৭০ টাকায় গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল বিষাক্ত এই মদ। চিকিৎসকদের মতে, মাত্রাতিরিক্ত মিথাইল অ্যালকোহল পেটে যাওয়ার ফলেই লিভার বিকল হয়ে এবং অপটিক নার্ভ পুড়ে গিয়ে অধিকাংশের দৃষ্টিশক্তি সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে। ঘটনার জেরে ইতিমধ্যেই বান্দার স্টেশন ইন-চার্জ ও আবগারি দফতরের অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার-সহ একাধিক আধিকারিককে সাসপেন্ড করা হয়েছে। মূল অভিযুক্ত-সহ গ্রেফতার করা হয়েছে ১৭ জনকে। পরিস্থিতি সামাল দিতে মুখ্যমন্ত্রী মোহন যাদব এলাকা সফর করে বিচারবিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন এবং রাজ্যজুড়ে মাদকবিরোধী অভিযানের আশ্বাস দিয়েছেন।
প্রতিটি মৃতের পরিবারকে চার লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ ঘোষণা করা হলেও গ্রামবাসীদের ক্ষোভের আগুন কমছে না। স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে গ্রামের মুদি দোকানেও অবৈধ দেশি মদ বিক্রি হচ্ছিল এবং পুলিশের সঙ্গে চোরাকারবারিদের যোগসাজশ ছিল ওপেন সিক্রেট। ঘটনার পর রাজনৈতিক পারদও চড়েছে; প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী দ্বিগ্বিজয় সিং প্রশাসনের একাংশ ও শাসকদল বিজেপি নেতাদের প্রত্যক্ষ মদতকে কাঠগড়ায় তুলেছেন, যদিও বিজেপি নেতৃত্ব এই অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে। ক্ষতিপূরণের টাকার চেয়ে হারানো দৃষ্টি আর পরিবারের একমাত্র রোজগেরেদের হারিয়ে কার্যত দিশাহারা গোটা বুন্দেলখণ্ড।














