আন্তর্জাতিক স্তরে ফের সম্মানিত হলো ভারতের ডিজিটাল ইন্ডিয়া উদ্যোগ। জেনেভায় অনুষ্ঠিত ‘ওয়ার্ল্ড সামিট অন দি ইনফরমেশন সোসাইটি’ বা ডব্লিউএসআইএস ফোরাম ২০২৬-এ ভারতের দূরসঞ্চার মন্ত্রকের ফ্ল্যাগশিপ প্রকল্প ‘সমৃদ্ধ গ্রাম : ভারতনেট চালিত ইন্টিগ্রেটেড ফিজিশাল সার্ভিস ডেলিভারি মডেল’ মর্যাদাপূর্ণ গ্লোবাল উইনার বা বিশ্ব সেরা প্রকল্পের পুরস্কার জয় করেছে। ‘অ্যাকশন লাইন সি-ছয় – এনাবলিং এনভায়রনমেন্ট’ বিভাগে এই অনন্য সম্মান পেয়েছে ভারত। প্রত্যন্ত ও গ্রামীণ এলাকায় সমন্বিত ডিজিটাল পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর যে দূরদর্শী ভাবনা, এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি তারই প্রতিফলন।
ইন্টারন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়ন বা আইটিইউ-এর নেতৃত্বে পরিচালিত এই ডব্লিউএসআইএস পুরস্কারকে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) খাতের অন্যতম শীর্ষ বিশ্ব সম্মান হিসেবে গণ্য করা হয়। টেকসই বা স্থায়ী উন্নয়নের লক্ষ্যে ডিজিটাল রূপান্তরকে কাজে লাগানোর জন্য বিশ্বজুড়ে এই পুরস্কার দেওয়া হয়ে থাকে। ‘ভারতের মুকুটে আরও একটি নতুন পালক’ : জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া এই গৌরবময় অর্জনের পর কেন্দ্রীয় যোগাযোগ এবং উত্তর-পূর্ব অঞ্চল উন্নয়ন মন্ত্রী জ্যোতিরাদিত্য এম. সিন্ধিয়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘এক্স’-এ (সাবেক টুইটার) দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।
তিনি এই সাফল্যকে ‘বিশ্বমঞ্চে ভারতের মুকুটে আরও একটি নতুন পালক” বলে অভিহিত করেন। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বলেন, এই সম্মান প্রমাণ করে যে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর অন্তর্ভুক্তিমূলক ‘ডিজিটাল ইন্ডিয়া’র স্বপ্ন আজ বিশ্বজুড়ে সমাদৃত, যেখানে প্রযুক্তির সুবিধা একদম শেষ প্রান্তের গ্রামে থাকা নাগরিকের কাছেও পৌঁছে যাচ্ছে। তিনি আরও যোগ করেন, ভারতনেটের শক্তিতে বলীয়ান ‘সমৃদ্ধ গ্রাম’ প্রকল্প গ্রামীণ সংযোগ বা কানেক্টিভিটিকে এক বিরাট সুযোগে রূপান্তরিত করেছে এবং ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার বা ডিপিআই-এর ক্ষেত্রে ভারতের বিশ্ব নেতৃত্বকে পুনর্প্রতিষ্ঠিত করেছে। ভারতের নিজস্ব প্রয়োজনের জন্য তৈরি এই মডেলটি এখন বিশ্বের অন্যান্য দেশের কাছেও একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হতে পারে। কী এই ‘সমৃদ্ধ গ্রাম’ প্রকল্প এবং কীভাবে কাজ করে? দূরসঞ্চার মন্ত্রকের এই বিশেষ উদ্যোগটি মূলত ‘ভারতনেট’ পরিকাঠামোর ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। এই প্রকল্পের মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো গ্রাম স্তরে স্থাপিত ‘সমৃদ্ধি কেন্দ্র’।
এগুলি হলো এমন এক একটি ‘ওয়ান-স্টপ হাব’ যেখানে নির্ভরযোগ্য টেলিকম সংযোগ এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মেলবন্ধনে গ্রামীণ মানুষকে সরাসরি শারীরিক ও ডিজিটাল (ফিজিশাল) মাধ্যমে একাধিক প্রয়োজনীয় পরিষেবা দেওয়া হয়। একই ছাদের নিচে গ্রামীণ নাগরিকরা যে সমস্ত অত্যাধুনিক সুবিধা পাচ্ছেন, সেগুলি হলো : স্বাস্থ্য পরিষেবা : সমৃদ্ধি কেন্দ্রগুলির মাধ্যমে সাধারণ মানুষ ঘরে বসেই দূরবর্তী চিকিৎসকদের পরামর্শ (টেলি-কনসালটেশন) পাচ্ছেন। এছাড়া ‘হেলথ এটিএম’-এর সাহায্যে বিভিন্ন শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং ‘প্রধানমন্ত্রী জন ঔষধি কেন্দ্র’-এর মাধ্যমে সুলভে ওষুধ পাওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে। আধুনিক শিক্ষা ও দক্ষতা : গ্রামীণ পড়ুয়াদের জন্য তৈরি করা হয়েছে স্মার্ট ক্লাসরুম এবং এআর/ভিআর (অগমেন্টেড রিয়্যালিটি/ভার্চুয়াল রিয়্যালিটি) প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে আধুনিক দক্ষতা উন্নয়নের প্রশিক্ষণ।
স্মার্ট কৃষি ব্যবস্থা : কৃষকদের সুবিধার্থে আইওটি (ইন্টারনেট অফ থিংস) ভিত্তিক মাটি পরীক্ষা, ড্রোনের সাহায্যে জমিতে সার ও কীটনাশক স্প্রে এবং মোবাইল অ্যাপ-ভিত্তিক স্মার্ট সেচ ব্যবস্থার সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও ই-গভর্নেন্স : সাধারণ মানুষ এই কেন্দ্রগুলি থেকে সিএসসি (কমন সার্ভিস সেন্টার), ব্যাঙ্কিং করেসপন্ডেন্ট পরিষেবা এবং স্থানীয় পণ্য কেনাবেচার জন্য ই-কমার্স সহায়তা পাচ্ছেন। উন্নত সংযোগ ও নিরাপত্তা : গ্রামগুলিতে এফটিটিএইচ(ফাইবার টু দ্য হোম) এবং পিএম-বাণী ওয়াই-ফাই সংযোগ দেওয়ার পাশাপাশি সিসিটিভি-র মাধ্যমে সার্বিক গ্রাম নজরদারির ব্যবস্থাও করা হয়েছে। তীব্র প্রতিযোগিতা ও আন্তর্জাতিক স্ক্রিনিং পার করে জয়ী ভারতএই পুরস্কার প্রাপ্তির পথটি মোটেও সহজ ছিল না। প্রকল্প জমা দেওয়া, আন্তর্জাতিক স্তরের কঠোর স্ক্রিনিং এবং বিশ্বব্যাপী অনলাইন ভোটিংয়ের মতো একাধিক ধাপ পেরিয়ে ‘সমৃদ্ধ গ্রাম’ এই শিরোপা জিতেছে।
অনলাইন ভোটিং পর্বে বিশ্বজুড়ে মনোনীত সমস্ত প্রকল্পের পক্ষে ২২ লক্ষেরও বেশি ভোট পড়েছিল। ২০২৬ সালের ডব্লিউএসআইএস পুরস্কারের মোট ১৮টি ক্যাটাগরির মধ্যে ভারতের মাত্র দুটি প্রকল্প ‘চ্যাম্পিয়ন প্রজেক্ট’ হিসেবে শীর্ষ পাঁচে জায়গা করতে পেরেছিল, যার মধ্যে ‘সমৃদ্ধ গ্রাম’ শেষ পর্যন্ত বিশ্ব সেরার মুকুট ছিনিয়ে নেয়। বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম গ্রামীণ ব্রডব্যান্ড উদ্যোগ ‘ভারতনেট’-এর মাধ্যমে ভারতের ২ লক্ষ ১৭ হাজারেরও বেশি গ্রাম পঞ্চায়েতকে অনলাইন ও পরিষেবা-প্রস্তুত করা সম্ভব হয়েছে। রাষ্ট্রপুঞ্জের একাধিক ‘টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা’ বা এসডিজি (যেমন- মানসম্মত শিক্ষা, সুস্বাস্থ্য, আর্থিক সমতা ও উদ্ভাবন) পূরণে এই প্রকল্প অনন্য অবদান রাখছে। বিশ্বমঞ্চের এই স্বীকৃতি প্রমাণ করল যে সঠিক নীতি ও প্রযুক্তির মেলবন্ধনে গ্রামীণ ভারতের ডিজিটাল ব্যবধান ঘুচিয়ে এক ঐতিহাসিক আর্থ-সামাজিক রূপান্তর ঘটানো সম্ভব।













