আমরা পুড়লে তোমাদেরও সঙ্গে নিয়ে পুড়ব—জনপ্রিয় এক কল্পবিজ্ঞান চলচ্চিত্রের এই স্লোগানকে প্ল্যাকার্ডে তুলে ধরে ব্রাসেলসের রাজপথে প্রতিবাদে শামিল হয়েছিল উনিশ বছরের মায়া গর্ডেল। শুধু বেলজিয়াম নয়, প্যারিসের উপনগরী থেকে বেলগ্রেড কিংবা মিলানের অলিগলি—ইউরোপের বিভিন্ন দেশের রাজপথ এখন প্রকম্পিত তরুণ প্রজন্মের উত্তাল বিক্ষোভে।
ভাঙাচোরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের অভাব, আবাসন সংকট, আকাশছোঁয়া জীবনযাত্রার খরচ এবং দুর্নীতি—এই পুঞ্জীভূত ক্ষোভ থেকেই ইউরোপজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে এই প্রতিবাদী দাবানল। পুলিশি জলকামান, কাঁদানে গ্যাস আর স্টান গ্রেনেডকে উপেক্ষা করে যেভাবে ১৯৯৭ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে জন্ম নেওয়া অর্থাৎ ‘জেন-জি’ প্রজন্মের যুবসমাজ রাস্তায় নেমেছে, তা অতীতে বাংলাদেশ, নেপাল বা ভারতের সাম্প্রতিক তরুণ আন্দোলনের স্মৃতিকেই উসকে দিচ্ছে।
এই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সাফল্য মিলেছে সার্বিয়ায়, যেখানে প্রায় দুই বছরের রক্তক্ষয়ী বিক্ষোভের পর এই সপ্তাহান্তে নির্বাচনে পরাজিত হয়ে গদিচ্যুত হয়েছেন দীর্ঘদিনের শাসক আলেকসান্দার ভুচিচ। মিলানের এক বিক্ষোভরত ছাত্রী কিয়ারার মতে, বর্তমান শাসকশ্রেণি তাঁদের প্রজন্মের কাছ থেকে ভবিষ্যতে স্বপ্ন দেখার অধিকারটুকুও কেড়ে নিয়েছে; পর্যাপ্ত শিক্ষকহীন জরাজীর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কম বেতনের অনিশ্চিত চাকরি আর আকাশছোঁয়া ভাড়ার ঘুপচি ঘরে বন্দি জীবনের বাইরে কোনো ভবিষ্যৎ তাঁরা দেখতে পাচ্ছেন না।
একই ছবি ফ্রান্সেও, যেখানে সরকারি তথ্য অনুযায়ী ২০০০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে শিক্ষা খাতে বাজেট কমলেও প্রবীণদের পেনশনের বহর মাত্রাতিরিক্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে বয়স্ক সমাজের যাবতীয় আর্থিক বোঝা তরুণ প্রজন্মের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধেও সোচ্চার হয়েছে ইউরোপের নতুন প্রজন্ম।
প্যারিস থেকে শুরু করে আলবেনিয়া কিংবা ব্রাসেলস—সব জায়গাতেই পড়ুয়াদের একটাই অভিযোগ, সরকার তাঁদের কখনও গুরুত্ব দিয়ে শোনেনি। ব্রাসেলসের ছাত্রীদের বক্তব্য, শান্তভাবে দাবি তুললে কেউ কান দেয় না; ক্যামেরা বা গণমাধ্যম তখনই নজর দেয় যখন রাস্তায় আগুন জ্বলে।
আলবেনিয়ার তিরানায় প্রধানমন্ত্রী এডি রামার সরকারের বিরুদ্ধে রাস্তায় নামা পড়ুয়ারা জানিয়েছেন, দুর্নীতি ও রাজনৈতিক যোগাযোগের দাপটে মেধা থাকা সত্ত্বেও নিজের দেশে তরুণদের কোনো ভবিষ্যৎ নেই এবং প্রায় প্রত্যেকেই দেশ ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন। একই ধরনের দাবিতে চলতি সপ্তাহান্তে জার্মানিতেও বৃহত্তর বিক্ষোভের ডাক দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক নেতাদের ব্যর্থতার পর সার্বিয়ার মতো দেশে এখন রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুদায়িত্ব কাঁধে নিতে চলা এই তরুণেরা কোনো অভিজ্ঞতাহীনতার ভয় পাচ্ছেন না; বরং তাদের স্পষ্ট বার্তা—অভিজ্ঞ নেতাদের শাসনব্যবস্থা তাঁদের যে অন্ধকারের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল, সেখান থেকে মুক্তির পথ এখন তরুণদের নিজেদের হাতেই ছিনিয়ে নিতে হবে।














