মেরুকরণের চেনা ছক ছেড়ে এবার বঙ্গ বিজেপির হাতিয়ার স্থানীয় সমস্যা। চব্বিশের লোকসভা ভোটের পর ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনে সাফল্যের লক্ষ্যে রণকৌশল আমূল বদলে ফেলল গেরুয়া শিবির। শুধুমাত্র হিন্দুত্ব বা ধর্মীয় আবেগে বাংলায় যে কেল্লাফতে করা সম্ভব নয়, তা একুশের বিধানসভা নির্বাচনেই হাড়হাড়ে টের পেয়েছিলেন কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। সেই অভিজ্ঞতার রেশ টেনেই এবার জনমানসে পৌঁছাতে সিপিএমের পুরোনো কায়দাকেই আপন করে নিচ্ছে তারা।
বাংলার ২৯৪টি বিধানসভা কেন্দ্রের জন্য পৃথক পৃথক ‘চার্জশিট’ তৈরি করে বাড়ি বাড়ি যাওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছেন সুকান্ত-শুভেন্দুরা। কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষক ভূপেন্দ্র যাদবের মস্তিস্কপ্রসূত এই পরিকল্পনাকে রাজনৈতিক মহলের অনেকেই ‘রাম-বাম জোট’ বলে কটাক্ষ করতে শুরু করেছেন। বিজেপি সূত্রের খবর, প্রতিটি বিধানসভা কেন্দ্রের জন্য নির্দিষ্ট ২০ থেকে ২৫টি স্থানীয় সমস্যাকে চিহ্নিত করা হয়েছে।
কোনো এলাকায় ভাঙাচোরা রাস্তা, কোথাও বেহাল নিকাশি ব্যবস্থা, আবার কোথাও স্বাস্থ্য পরিষেবা বা বন্ধ কলকারখানার সমস্যাকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। আগে এই ধরনের প্রচার মূলত বামপন্থীদের একচেটিয়া অধিকার ছিল। নিচুতলার কর্মীদের নিয়ে বাড়ি বাড়ি প্রচার এবং স্থানীয় অভাব-অভিযোগকে হাতিয়ার করে শাসকদলের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়া বাম আমলের পরিচিত দৃশ্য। এবার সেই পথেই হাঁটছে বিজেপি। শিবপুর থেকে বাঘমুণ্ডি কিংবা উত্তরবঙ্গের আলিপুরদুয়ার প্রতিটি এলাকার জন্য দুই পাতার একটি করে বিশেষ খসড়া তৈরি হয়েছে। নিচুতলার কর্মীরা সেই নথি নিয়ে ভোটারদের দরজায় কড়া নাড়ছেন। দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব মনে করছেন, গত বিধানসভা নির্বাচনে বুথস্তরে সংগঠনের অভাব ছিল স্পষ্ট।
এবার সেই ফাঁক ভরাট করতে মরিয়া পদ্মশিবির। যদিও নিচুতলার সংগঠন কতটা মজবুত হয়েছে তা নিয়ে দলের অন্দরেই সংশয় রয়েছে, তবে ইস্যু ভিত্তিক প্রচারে খামতি রাখতে চাইছে না রাজ্য নেতৃত্ব। শুভেন্দু অধিকারী বা সুকান্ত মজুমদাররা জনসভায় হিন্দুত্ব নিয়ে সরব হলেও, সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত ও নাগরিক সমস্যাগুলোকে উপেক্ষা করলে যে ভোটারদের মন জয় করা কঠিন, সেই উপলব্ধি থেকেই এই কৌশল বদল।
জেলার নেতাদের থেকে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতেই এই প্রচারপত্রগুলি সাজানো হয়েছে। এরই সমান্তরালে তরুণ প্রজন্মের নজর কাড়তে ১২ জানুয়ারি স্বামী বিবেকানন্দের জন্মদিবসে রাজ্যজুড়ে বিশাল ‘বিবেক যাত্রা’র ডাক দিয়েছে বিজেপির যুব মোর্চা। যুব মোর্চার রাজ্য সভাপতি ডা. ইন্দ্রনীল খাঁ জানিয়েছেন, স্বামীজির আদর্শকে পাথেয় করে রাজ্যের প্রতিটি কোণায় শোভাযাত্রা করা হবে। একদিকে স্থানীয় সমস্যা নিয়ে মানুষের দুয়ারে পৌঁছানো আর অন্যদিকে মনীষীদের আবেগ ব্যবহার করে যুবশক্তিকে একজোট করা এই দ্বিস্তরীয় মডেলেই এখন ছাব্বিশের রণনীতি সাজাচ্ছে বঙ্গ বিজেপি। রাজনীতির কারবারিরা মনে করছেন, সিপিএমের স্টাইলে স্থানীয় ইস্যুতে ঝাঁপিয়ে পড়ার এই সিদ্ধান্ত বিজেপির জন্য এক বড় পরীক্ষা হতে চলেছে।















