বিশ্বকাপের নক-আউট পর্বে ব্রাজিল বনাম জাপানের দ্বৈরথ নিয়ে আলোচনা হবে, আর সেখানে জিকোর নাম উঠবে না, তা কার্যত অসম্ভব। এশীয় দেশটিতে আধুনিক ফুটবলের অন্যতম রূপকার হিসেবে গণ্য করা হয় এই ব্রাজিলীয় কিংবদন্তিকে। সোমবার ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর শেষ বত্রিশের মহারণে যখন দুই দল মুখোমুখি হবে, তখন এই কিংবদন্তির মন যে কিছুটা হলেও দ্বিখণ্ডিত থাকবে, তা বলাই বাহুল্য। তবে ‘ও গালিনহো’ খ্যাত তারকা স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, জন্মভূমির টানে তিনি সেলেসাওদেরই সমর্থন করবেন। সম্প্রতি ফিফা-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জিকো বলেন, ‘আমি অবশ্যই ব্রাজিলকে সমর্থন করব। সর্বোপরি আমি একজন ব্রাজিলীয়।
কিন্তু জাপান যদি জিতে যায়, তবে তাই হোক। আমি শুধু এটুকু জানি যে একটা দারুণ ম্যাচ হতে চলেছে, কারণ জাপান এখন সত্যিকারের পেশাদার ফুটবল খেলে’। বিশ্বকাপের মঞ্চে এই নিয়ে দ্বিতীয়বার মুখোমুখি হতে চলেছে ব্রাজিল ও জাপান। এর আগে ২০০৬ সালের জার্মানি বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে দেখা হয়েছিল এই দুই দলের, যেখানে ব্রাজিল ৪-১ গোলে জয়লাভ করেছিল। কাকতালীয়ভাবে সেই ম্যাচে জাপানের ডাগআউটে কোচ হিসেবে বসেছিলেন স্বয়ং জিকো। সেই আবেগঘন স্মৃতি রোমন্থন করে তিনি বলেন, ‘খেলার আগে ফুটবলারদের বলেছিলাম, ছোটবেলায় স্কুলে যেমনটা শিখেছি, সেভাবেই ব্রাজিলের জাতীয় সঙ্গীত গাইব।
কিন্তু বল একবার মাঠে গড়ানোর পর আমি পুরোপুরি জাপানের সঙ্গেই ছিলাম। আমার তখন কিংবদন্তি দিদির কথা মনে পড়ছিল, যিনি ব্রাজিলের হয়ে জোড়া বিশ্বকাপ জেতার পর ১৯৭০ সালে সেলেসাওদের বিরুদ্ধেই পেরুর কোচিং করিয়েছিলেন’। জিকো জানান, ২০০৬ সালের সেই ম্যাচে প্রথমার্ধের একেবারে শেষলগ্নে গোল খেয়েছিল তাঁর দল। সেই প্রসঙ্গের রেশ টেনেই তিনি হাসতে হাসতে যোগ করেন, ‘রোনাল্ডো নাকি আমাকে নিজের আদর্শ মানে! অথচ ক্যারিয়ারে ওর একমাত্র হেডে করা গোলটা আমার দলের বিরুদ্ধেই করেছিল’। ১৯৯৮ সালে প্রথমবার যোগ্যতা অর্জনের পর থেকে জাপান আর কখনোই বিশ্বকাপের মূল পর্ব থেকে ছিটকে যায়নি। জিকোর মতে, জাপানি ফুটবলের এই ধারাবাহিকতা তাদের ক্রমবিকাশেরই প্রমাণ, যার ফলে তারা আজ বিশ্ব ফুটবলের এলিট দলগুলোকে টেক্কা দেওয়ার জায়গায় পৌঁছেছে। তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন, জাপানের বর্তমান বিশ্বকাপ স্কোয়াডের ২৬ জন খেলোয়াড়ের মধ্যে ২৩ জনই এখন ইউরোপের শীর্ষ লিগগুলিতে— যেমন বুন্দেসলিগা, সিরি-এ কিংবা প্রিমিয়ার লিগে খেলেন। দলের ৩ জন মাত্র দেশীয় লিগে খেলেন, যার মধ্যে ২ জন গোলরক্ষক এবং অন্যজন হলেন ইউতো নাগাতোমো।
এটি তাঁর পঞ্চম বিশ্বকাপ এবং তিনি দলে মূলত একজন নেতার ভূমিকা পালন করছেন। গত দুই বিশ্বকাপেই শেষ ষোলো থেকে বিদায় নিতে হয়েছিল জাপানকে। ২০১৮ সালে বেলজিয়ামের বিরুদ্ধে ২-০ গোলে এগিয়ে থেকেও ৩-২ ব্যবধানে হার এবং ২০২২ সালে ক্রোয়েশিয়ার কাছে টাইব্রেকারে হার তাদের হৃদয় ভেঙেছিল। দু’বারই তারা জিতলে পরের রাউন্ডে ব্রাজিলের মুখোমুখি হত। জিকোর মতে, কৌশলগত উন্নতির পাশাপাশি জাপানের সবচেয়ে বড় উত্তরণ ঘটেছে মানসিকতায়। তিনি বলেন, ‘আগে ওদের প্রধান সমস্যা ছিল মনস্তাত্ত্বিক। কিন্তু এখন ওরা প্রতিকূল পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে জানে এবং পিছিয়ে পড়লেও দুর্দান্তভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারে’। বিগত কয়েক বছরে ব্রাজিল, জার্মানি, স্পেন ও ইংল্যান্ডের মতো বিশ্ব ফুটবলের পরাশক্তিদের হারানোর নজির রয়েছে জাপানের। তাই তারা এখন যেকোনো পরিস্থিতির জন্যই প্রস্তুত বলে মনে করেন তিনি।
এই ম্যাচের সঙ্গে জিকোর আরও একটি ব্যক্তিগত যোগসূত্র রয়েছে। জাপানের বর্তমান কোচ হাজিমে মোরিয়াসু এবং ব্রাজিলের কোচ কার্লো আনচেলোত্তি— দু’জনের বিরুদ্ধেই নিজের খেলোয়াড়ি জীবনে মাঠে নেমেছেন জিকো। দুই কোচের ভূয়সী প্রশংসা করে তিনি বলেন, ‘আমি দু’জনকেই খুব ভালো করে চিনি। দু’জনেই ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হিসেবে খেলত। ভাগ্যিস, ওরা কেউই মাঠে নোংরা ফুটবল খেলত না। দুর্দান্ত কৌশল ও দক্ষতার অধিকারী ছিল বলেই, আজ কোচ হিসেবেও ওরা এত নিখুঁতভাবে খেলাটা পড়তে পারে’। সব মিলিয়ে সোমবারের এই মেগা-ম্যাচ যে দুই দলের কোচের মগজাস্ত্রের এক দারুণ লড়াই হতে চলেছে, তা নিয়ে ফুটবলপ্রেমীদের মনে কোনো সন্দেহ নেই।













