ঔপনিবেশিক যুগে এই পুজো রাজনৈতিক বন্দিদের মধ্যে দেশাত্মবোধ ও ঐক্য স্থাপন, এবং ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের এক অভিনব কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন আমলে ভারতে একটি আধুনিক কারাব্যবস্থা চালু করার মূল উদ্দেশ্য ছিল অপরাধ দমন ও শৃঙ্খলা বজায় রাখা। টমাস ব্যাবিংটন ম্যাকাওলের তত্ত্বাবধানে ১৮৩৮ সালে গঠিত প্রিজন ডিসিপ্লিন কমিটি এই ব্যবস্থাকে একটি আইনি কাঠামো দিয়েছিল। তবে, বাস্তবে এই কারাব্যবস্থা রাজনৈতিক বিরোধীদের দমনের এক চরম হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হত। কারাগারগুলো শৃঙ্খলার কেন্দ্র না হয়ে চরম নির্যাতন ও নিপীড়নের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল, যেখানে রাজনৈতিক বন্দিদের উপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা।
বন্দি জীবনের এই যন্ত্রণার সুস্পষ্ট চিত্র ফুটে উঠেছে ঐতিহাসিক কারা-সাহিত্যে। কাজী নজরুল ইসলামের ‘রাজবন্দির জবানবন্দি’ (১৯২৩) এবং বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ ও ‘কারাগারের রোজনামচা’র মতো গ্রন্থগুলো বন্দি জীবনের অভিজ্ঞতা লিপিবদ্ধ করেছে। এই সাহিত্য শুধু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বর্ণনা নয়, বরং ঔপনিবেশিক কারাব্যবস্থার বিরুদ্ধে বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিরোধের দলিল। ব্রিটিশরা বন্দিদের তাদের স্বজন থেকে বিচ্ছিন্ন রাখার চেষ্টা করত, যেমন সুভাষচন্দ্র বসুকে ব্রহ্মদেশের মান্দালয় জেলে পাঠানো হয়েছিল।
এই বিচ্ছিন্নতা সত্ত্বেও, বিপ্লবীরা তাদের অধিকার আদায়ের জন্য বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করতেন, যার মধ্যে অনশন ধর্মঘট এবং কর্তৃপক্ষের কাছে আইনি আবেদন করা অন্যতম। এই প্রসঙ্গে, সুভাষচন্দ্র বসুর মতো নেতাদের দুর্গাপুজো আয়োজনের জন্য কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করাকে কেবল একটি ধর্মীয় অধিকারের দাবি হিসেবে দেখা যায় না। বরং এটি ছিল ঔপনিবেশিক কারা কর্তৃপক্ষের উপর চাপ সৃষ্টি করার এবং তাদের নিরঙ্কুশ ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করার একটি কৌশল। আইনি কাঠামোর আড়ালে দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে এটি ছিল এক ধরনের অহিংস প্রতিরোধ।















