যাদবপুর আছে যাদবপুরেই। মাত্র ২ বছর আগে প্রথম বর্ষের এক ছাত্রের হত্যাকাণ্ডের পরেও যে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কিছুই বদলায়নি তার প্রমাণ আরও একবার মিলল যাদবপুরে ইংরেজি তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী অনামিকার রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায়। তরুণী ছাত্রীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়। বৃহস্পতিবার রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ঝিলে পড়ে গিয়েছিলেন ওই তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী ইংরেজি বিভাগের অনামিকা মণ্ডল। তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তবে চিকিৎসকরা তাকে মৃত বলে ঘোষণা করেছেন। এদিকে মেয়ের মৃত্যুতে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন তার বাবা-মা।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অনুষ্ঠান চলছিল। ‘ড্রামা ক্লাবে’র তরফে ছিল বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। গভীর রাত পর্যন্ত ক্যাম্পাসের মধ্যে এই অনুষ্ঠান চলে বলে দাবি। তারই মধ্যে গতকাল রাত ১০টা থেকে ১০.৩০টা নাগাদ ওই ছাত্রীকে উদ্ধার করা হয় বলে খবর। সূত্রের খবর, বিশ্ববিদ্যালয়ের চার নম্বর গেটের কাছে একটি শৌচালয় রয়েছে। ঠিক তার পাশের পুকুর, কেউ কেউ ঝিল বলেন, ঠিক ওই স্থান থেকেই উদ্ধার হয় ‘অচেতন’ পড়ুয়ার দেহ। তবে পুকুরে ডুবে তাঁর মৃত্যু নাকি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথে, এ বিষয়ে স্পষ্ট কোনও তথ্য মেলেনি এখনও। ময়নাতদন্তের পরে বিস্তারিত জানা যাবে বলে খবর।
ইংরেজি বিভাগের এই ছাত্রীর রহস্যমৃত্যু ফের বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দিকে ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা নিয়ে অভিযোগ উঠছে। ক্যাম্পাসে আদালতের নির্দেশের পরও শেষ পর্যন্ত কতগুলি সিসিটিভি বসেছে এবং যেখানে ঘটনা ঘটেছে সেই ঝিলপাড়ে আদৌ সিসিটিভি বসেছে কিনা তাও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। ঘটনার সময়ের সিসিটিভি আছে কিনা স্পষ্ট নয়। ছাত্রী নিজেই পড়ে গেছেন নাকি তাকে কেউ ঠেলে ফেলে দিয়েছে? ছাত্রীর আচরণে পড়ে যাওয়ার আগে কোনও অস্বাভাবিকতা ছিল কি? সেই সময় তিনি একাই ঝিলপাড়ে ছিলেন নাকি সঙ্গে কেউ ছিল? এই প্রশ্নের উত্তর বা সিসিটিভি ফুটেজ আছে কিনা কোনওটাই এখনও পর্যন্ত স্পষ্ট নয়। যারা ছাত্রীকে জল থেকে উদ্ধার করেছে তাদের সঙ্গে কথা বলছে পুলিস। উদ্ধারের সময় কি ছাত্রী বেঁচে ছিলেন? জানতে চায় পুলিস। ছাত্রীকে কেউ জলে পড়ে যেতে দেখেছেন?
জলে পড়ে যাওয়ার আগে বা পড়ে যাওয়ার সময় ছাত্রীর আচরণে কোন়ও অস্বাভাবিকতা ছিল? তিনি কি সেই সময় অপ্রকৃতিস্থ অবস্থায় ছিলেন? সমস্ত প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করছে পুলিস। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় শুক্রবার সকালেই পরিদর্শনে পৌঁছায় সুপ্রিম কোর্টের তৈরি টাস্ক ফোর্স। বিশ্ববিদ্যালয় ঢুকেই বৃহস্পতিবারের বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তুললেন তারা। ছাত্র-ছাত্রীদের মেন্টাল হেলথ সংক্রান্ত সমস্যা মেটাতেই গোটা দেশ জুড়ে এই টাস্ক ফোর্স তৈরি করেছে সুপ্রিম কোর্ট। সেই টাস্ক ফোর্সই আজ যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শন করছে।বিশ্ববিদ্যালয় ঢুকেই গতকালের ছাত্রীর মৃত্যু নিয়ে জানতে চাইলেন তুললেন তারা। এর মাঝেই উঠে এল এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের তরফে খবর, গতকাল অত রাত পর্যন্ত অনুষ্ঠান হওয়ার কথা জানানোই হয়নি কলেজে।
বরং সন্ধ্যা ৮টা পর্যন্ত অনুষ্ঠান হবে বলে আগাম জানান হয়েছিল অনুষ্ঠানের আয়োজকদের তরফে। এই বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ উপাচার্য অমিতাভ দত্ত জানিয়েছেন, ঘটনা জানাজানি হওয়ার পরেই ছাত্রীকে উদ্ধার করে অ্যাম্বুল্যান্সে নিয়ে যাওয়া হয় কেপিসি-তে। কিন্তু বাঁচানো যায়নি। এটা আমাদের কাছে দুঃখজনক। গতকাল হাসপাতালে ইংরেজি বিভাগের প্রধান উপস্থিত ছিলেন। তবে গতকাল কত রাত পর্যন্ত অনুষ্ঠান চলেছে সেই খবর নেই আমাদের কাছে। অমিতাভ জানান, গতকাল বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রয়োজনের তুলনায় কম নিরাপত্তারক্ষী ছিল।
তাঁর কথা অনুযায়ী বিগত কয়েক বছরে অনেক নিরাপত্তারক্ষী অবসর নিয়েছে ফলে ঘাটতি বেড়েছে নিরাপত্তারক্ষীর। সীমিত নিরাপত্তারক্ষী নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করতে হচ্ছে বলেও এদিন দাবি করেন তিনি। অন্যদিকে, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর থেকে ছাত্রীর দেহ উদ্ধারকে ঘিরে শোরগোল পরে গিয়েছে। ফিরে এসেছে আরও এক পড়ুয়ার রহস্যজনক মৃত্যুর স্মৃতি! দুই বছর আগের ভয়াবহ স্মৃতি নতুন করে মনে করিয়ে দিল এই মৃত্যু। ২০২৩ সালের ৯ অগস্ট একই বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রথম বর্ষের এক ছাত্রকে গুরুতর জখম অবস্থায় হস্টেলের নীচে পাওয়া গিয়েছিল। ছেলেকে হারানোর কষ্ট আজও তাড়া করে বেড়াচ্ছে ওই পরিবারের সদস্যদের।
নিহত ছাত্রের মা-বাবার আক্ষেপ, আমাদের ছেলে হস্টেলের তিন তলার বারান্দা থেকে কেন ঝাঁপ দিয়েছিল, তা আজও আমরা জানতে পারিনি। কেউ সত্যিটা জানাল না। যাদবপুরে কোনও শৃঙ্খলা নেই। দুই বছর আগে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল যে ৩৭ লক্ষ টাকা খরচ করে পুরো ক্যাম্পাসে সিসিটিভি বসানো হবে। সেটি আদৌ হয়েছে কি? আমরা তো কোনও বদল দেখিনি। মফস্বলের মেধাবী ছেলেমেয়েরা কি শুধু মৃত্যুবরণ করার জন্য যাদবপুরে আসে? তাঁদের অভিযোগ, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় দীর্ঘদিন ধরেই র্যা গিংয়ের আঁতুড়ঘর। চার বছর আগে থেকেই তাঁরা প্রশাসনকে সতর্ক করেছিলেন, কিন্তু কার্যকর পদক্ষেপের অভাব ছিল স্পষ্ট।













