সরস্বতী পুজোর আনন্দ শেষ হতেই পূর্ব বর্ধমান জেলার দক্ষিণ দামোদর এলাকার বহু গ্রামে নেমে আসে এক শান্ত, সংযমী অথচ গভীর আবেগে ভরা দিন ‘শীতল ষষ্ঠী’। এই দিনটিকে ঘিরে আজও অটুট রয়েছে এক অনন্য লোকাচার, যেখানে আধুনিক রান্নার ঝাঁ চকচকে আয়োজন নয়, বরং প্রকৃতি ও শরীরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তৈরি খাবারই হয়ে ওঠে দিনের প্রধান অনুষঙ্গ। কৈয়ড় গ্রাম পঞ্চায়েতের তোড়কোনা গ্রাম এবং সেহারা গ্রাম পঞ্চায়েতের সেহারা গ্রামে শীতল ষষ্ঠী মানেই ‘গোটা সিদ্ধ’ বা স্থানীয় ভাষায় ‘সিজনে’।
এদিন কোনো সবজি কাটা হয় না। আস্ত আলু, কড়াইশুঁটি, মটরশুঁটি, কলাইয়ের ডাল, কুল, শিস পালং—সব একসঙ্গে সেদ্ধ করা হয়। সামান্য সর্ষের তেল, নুন আর অল্প চিনি—এই তিন উপাদানেই তৈরি হয় শীতের বিদায়ের সময়ের এই অনন্য গ্রামীণ খাবার। এলাকাবাসীরা জানান, সরস্বতী পুজোর দিনই রান্না করা হয় গোটা সিদ্ধ। তোড়কোনা গ্রামে আবার রয়েছে বিশেষ প্রথা—পুজোর পরের দিন ভাত, ডাল ও সিজনে সবটাই বাশি খেতে হয়। সঙ্গে থাকে পান্তা ভাত ও মাছের টক। বিশ্বাস, নতুন করে রান্না করলে শরীরে অসামঞ্জস্য দেখা দিতে পারে, তাই আগের দিনের খাবারই খেয়ে শরীরকে ধীরে-ধীরে ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। এই রীতির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে শুধু বিশ্বাস নয়, সুদূর অতীতের স্বাস্থ্যবোধও। লোককথা অনুযায়ী, সরস্বতী পুজোর পরই শীত বিদায় নেয় এবং বসন্তের সূচনা হয়।
এই সময় বহু মানুষ জ্বর, সর্দি-কাশি ও শরীর ব্যথায় ভোগেন। সেই কারণেই শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে ও হজমশক্তি ঠিক রাখতে গোটা সিদ্ধ খাওয়ার রীতি চালু হয়েছিল বলে মনে করেন প্রবীণরা। আজও বহু পরিবার এই প্রথা মেনে চলেন নিষ্ঠার সঙ্গে। আধুনিকতার দাপটে অনেক গ্রামেই হারিয়ে যাচ্ছে লোকাচার, কিন্তু দক্ষিণ দামোদরের এই গ্রামগুলো যেন এখনও প্রকৃতি ও প্রজন্মের মধ্যে এক অদৃশ্য সেতু গড়ে রেখেছে। শীতল ষষ্ঠীর দিনে গোটা সিদ্ধ খাওয়া তাই শুধু একটি খাদ্যাভ্যাস নয়—এ এক জীবন্ত সংস্কৃতি, যা ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে লড়াই করার শক্তি জোগায় গ্রামবাংলার মানুষজনকে।















