অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যাবে। বহু বৈধ ভোটার ভোটাধিকার হারাবেন। ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় একগুচ্ছ অনিয়মের অভিযোগ তুলে দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে এই ভাষাতেই তৃতীয় বার কড়া চিঠি লিখলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সাড়ে তিন পাতার চিঠিতে তিনি সাফ জানিয়েছেন, ভোটার তালিকা সংশোধনের এই কাজ আদতে একটি ‘প্রহসনে’ পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে শুনানির নামে বয়স্ক এবং অসুস্থ নাগরিকদের যে ভাবে ২০-২৫ কিলোমিটার দূরে যাতায়াত করতে বাধ্য করা হচ্ছে । অবিলম্বে এই ত্রুটিপূর্ণ প্রক্রিয়া সংশোধন করা না-হলে গণতান্ত্রিক কাঠামো ভেঙে পড়বে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। শনিবার পাঠানো এই চিঠিতে মুখ্যমন্ত্রী মূলত নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
রাজ্যে ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজ তথা ‘এসআইআর’ নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অসন্তোষ নতুন নয়। এর আগে ২০ নভেম্বর এবং ২ ডিসেম্বর একই বিষয়ে তিনি কমিশনকে চিঠি দিয়েছিলেন। কিন্তু পরিস্থিতির কোনও উন্নতি না হওয়ায় তিনি ফের সরব হয়েছেন। মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, বর্তমানে যে পদ্ধতিতে কাজ চলছে, তাতে বহু যোগ্য নাগরিকের নাম বাদ যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এই ‘ডিসএনফ্রানচাইজমেন্ট’ বা ভোটাধিকার হরণ আটকানোর আর্জি জানিয়েছেন তিনি। চিঠিতে মমতা অভিযোগ করেছেন, নির্বাচন কমিশন বিভিন্ন রাজ্যের জন্য বিভিন্ন মানদণ্ড স্থির করছে। বিশেষত প্রতিবেশী রাজ্য বিহারের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের নিয়মকানুন নিয়ে যে ফারাক রাখা হয়েছে, তা নিয়ে তিনি তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন।
মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগের অন্যতম বড় জায়গা হল বিহার ও পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকার তথ্যের যাচাইকরণ। তিনি চিঠিতে উল্লেখ করেছেন, বিহারে ‘ফ্যামিলি রেজিস্টার’ বা বংশতালিকাকে বৈধ পরিচয়পত্র হিসেবে গ্রহণ করা হলেও পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে তা করা হচ্ছে না। আরও চাঞ্চল্যকর দাবি করে তিনি লিখেছেন, এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশিকা কোনও প্রথাগত বিজ্ঞপ্তি বা বিধিবদ্ধ উপায়ে না পাঠিয়ে হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে পাঠানো হচ্ছে। সরকারি নির্দেশনামার তোয়াক্কা না করে মেসেজ পাঠিয়ে নিয়ম বদলে দেওয়াকে তিনি ‘গোপনীয়তা ও স্বেচ্ছাচারিতা’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তাঁর মতে, রাজ্য সরকারের দেওয়া স্থায়ী বাসিন্দার শংসাপত্রকেও গুরুত্ব দিচ্ছে না কমিশন।
প্রযুক্তিগত বিভ্রাট নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ যথেষ্ট গুরুতর। তিনি দাবি করেছেন, কমিশনের আইটি সিস্টেম বা তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থা অত্যন্ত অস্থির। এই ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে ‘ব্যাক-এন্ড’ থেকে ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে। নিয়ম অনুযায়ী, নির্বাচনী নিবন্ধন আধিকারিক বা ইআরও-দের অনুমতি ছাড়া নাম বাদ দেওয়া যায় না। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী অভিযোগ তুলেছেন, অনেক ক্ষেত্রে ইআরও-রা অন্ধকারের থাকছেন অথচ নাম বাদ পড়ে যাচ্ছে। একে তিনি জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের সরাসরি লঙ্ঘন বলে মনে করছেন। গোটা প্রক্রিয়ায় কোনও বেআইনি কাজ হয়ে থাকলে তার সম্পূর্ণ দায় কমিশনের ওপর বর্তাবে বলেও চিঠিতে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
ভোটারদের শুনানির নামে হয়রানি করা হচ্ছে বলে মুখ্যমন্ত্রী অভিযোগ তুলেছেন। তিনি জানিয়েছেন, ভোটারদের যখন শুনানিতে ডাকা হচ্ছে, তখন কেন ডাকা হচ্ছে তার নির্দিষ্ট কারণ জানানো হচ্ছে না। এর ফলে সাধারণ মানুষের মনে অহেতুক ভীতি ও উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে। বয়স্ক এবং অসুস্থ নাগরিকদেরও ২০-২৫ কিলোমিটার দূরে গিয়ে শুনানিতে হাজির হতে বাধ্য করা হচ্ছে। তাদের হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে । এমনকি, শুনানির পর ভোটাররা যে নথি জমা দিচ্ছেন, তার কোনও প্রাপ্তিস্বীকার বা ‘রিসিপ্ট’ দেওয়া হচ্ছে না। ভবিষ্যতে আইনি লড়াইয়ের ক্ষেত্রে এই রসিদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও কমিশন তা দিতে অস্বীকার করছে বলে মুখ্যমন্ত্রীর দাবি।
পর্যবেক্ষক নিয়োগ নিয়েও কমিশনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন মমতা। তিনি লিখেছেন, রাজ্য সরকারের পাঠানো প্যানেলকে অগ্রাহ্য করে কেন্দ্রীয় সরকারের গ্রুপ-বি কর্মীদের ‘মাইক্রো-অবজারভার’ হিসেবে নিয়োগ করা হচ্ছে। এই কর্মীদের প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা বা প্রশিক্ষণ নেই বলে তিনি দাবি করেছেন। এর ফলে তাঁরা নিজেদের এক্তিয়ারের বাইরে গিয়ে কাজ করছেন এবং রাজ্য প্রশাসনের সঙ্গে কোনও সমন্বয় রাখছেন না। বানানে সামান্য ভুল বা বয়সের তফাতের মতো ছোটখাটো সমস্যা সারাতে গিয়ে যেভাবে আন্তঃরাজ্য যাচাইকরণের নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে, তাকে তিনি ইচ্ছাকৃত সময়ক্ষেপণ বলে মনে করছেন।
সবশেষে, রাজনৈতিক প্রতিনিধিদের ব্রাত্য করে রাখার অভিযোগ তুলেছেন মুখ্যমন্ত্রী। এনুমারেশন পর্বে বুথ লেভেল এজেন্ট বা বিএলএ-রা সক্রিয় থাকলেও শুনানি প্রক্রিয়ায় তাঁদের ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। মুখ্যমন্ত্রী মনে করিয়ে দিয়েছেন, ভোটের দিন যেখানে রাজনৈতিক দলের এজেন্টরা উপস্থিত থাকেন স্বচ্ছতা বজায় রাখতে, সেখানে তালিকা সংশোধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়ায় তাঁদের কেন দূরে রাখা হচ্ছে? এই সিদ্ধান্ত পুরো প্রক্রিয়ার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে। অবিলম্বে এই ‘অ্যাড-হক’ প্রক্রিয়া বন্ধ না করলে দেশের গণতান্ত্রিক পরিকাঠামোর মূলে কুঠারাঘাত করা হবে বলেই তিনি মনে করছেন। এই বিষয়ে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ও আগেই সরব হয়েছিলেন। এবার মুখ্যমন্ত্রী নিজে ফের চিঠি পাঠানোয় বিষয়টি রাজনৈতিক ও আইনি মহলে নতুন মাত্রা পেল।














