Facebook
Twitter
LinkedIn
Threads
X
Email
WhatsApp
Telegram
StumbleUpon
Pinterest
Skype
Pocket

প্রতীক-বিচ্ছেদে দিশেহারা আলিমুদ্দিন

প্রতীক-বিচ্ছেদে দিশেহারা আলিমুদ্দিন

একে হুমায়ুন কবীর-মহম্মদ সেলিম বৈঠক ঘিরে দলের অন্দরে বিতর্কের চোরাস্রোত বইছিল। সেই বিতর্কের রেশ কাটতে না কাটতেই যেন ‘বিনা মেঘে বজ্রপাত’ তরুণ তুর্কি প্রতীক উর রহমানের ইস্তফাপত্র। গত চব্বিশ ঘণ্টা ধরে রাজ্য রাজনীতির আলিমুদ্দিন কেন্দ্রিক চর্চায় এখন একটাই নাম, প্রতীক উর রহমান। দক্ষিণ ২৪ পরগনার ডায়মন্ড হারবারের প্রান্তিক এলাকা থেকে উঠে আসা এই লড়াকু নেতাকে ধরে রাখতে এবার সরাসরি ময়দানে নামলেন স্বয়ং অভিভাবক বিমান বসু। তবে বর্ষীয়ান নেতার ‘মানভঞ্জন’ প্রচেষ্টায় বরফ আদতে কতটা গলল, তা নিয়ে মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত সিপিএমের অন্দরে ধন্দ মেটেনি।

প্রতীক উর তাঁর ইস্তফাপত্রে বিস্ফোরক অভিযোগ তুলেছেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, জেলা ও রাজ্য নেতৃত্বের কর্মপদ্ধতির সঙ্গে তিনি খাপ খাওয়াতে পারছেন না। শুধু রাজ্য কমিটি বা জেলার দায়িত্ব থেকেই অব্যাহতি নয়, পার্টির প্রাথমিক সদস্যপদও ত্যাগ করতে চেয়ে চিঠিতে ‘হ্যাঁচকা টান’ মেরেছেন সম্পর্কের সুতোয়। এর পরেই পরিস্থিতি সামাল দিতে আসরে নামেন অশীতিপর বিমান বসু। প্রতীক উর স্বীকার করেছেন যে, বিমানের সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছে এবং তাঁকে রাজ্য দফতরে ডাকাও হয়েছে। তবে আলিমুদ্দিনে যাওয়া প্রসঙ্গে এখনও দোটানায় এই তরুণ নেতা। তাঁর সপাট জবাব, ‘ভাবনাচিন্তা করছি।’

মঙ্গলবার আলিমুদ্দিনের পথ মাড়াননি প্রতীক। বুধবার দলের রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর বৈঠক এবং তার পরবর্তী দু’দিন রাজ্য কমিটির সভা রয়েছে। সেখানে তিনি উপস্থিত থাকবেন কি না, তা নিয়ে চূড়ান্ত রহস্য বজায় রেখেছেন এই প্রাক্তন এসএফআই নেতা। প্রতীক উরের ঘনিষ্ঠ মহলের দাবি, পার্টির কার্যপদ্ধতি নিয়ে বেশ কিছু মৌলিক প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। সেই প্রশ্নের সদুত্তর না পাওয়া পর্যন্ত তাঁর পক্ষে দল করা মুশকিল। আবার বিমান বসুর সঙ্গে দেখা করার পর সমাধান না মিললে যদি তিনি অন্য কোনো সিদ্ধান্ত নেন, তবে দলের একাংশ তাঁকে ‘বিমানদাকে সম্মান না দেওয়ার’ তকমা দিয়ে হইহই করে ময়দানে নামবে। ফলে যথেষ্ট সতর্কভাবে পা মেপে ফেলছেন ডায়মন্ড হারবারের এই লড়াকু মুখ।

কেন প্রতীক উরকে নিয়ে এত মরিয়া আলিমুদ্দিন? সিপিএমের অন্দরমহল বলছে, প্রতীক উর দলের সেই ‘আসল’ শ্রেণির প্রতিনিধি, যাদের কথা পার্টি দলিলে বারবার উল্লেখ করা হয়। গরিব মুসলমান পরিবারের সন্তান প্রতীক দু’দফায় এসএফআই-এর রাজ্য সভাপতি ছিলেন। গত লোকসভা ভোটে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে চোখে চোখ রেখে লড়াই করা এই নেতা প্রান্তিক মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে বাম মহলে অত্যন্ত জনপ্রিয়। মহম্মদ সেলিম রাজ্য সম্পাদক থাকাকালীন প্রতীকের মতো এক লড়াকু সংখ্যালঘু মুখ এবং আর্থিক প্রতিবন্ধকতার সঙ্গে লড়াই করা ‘হোলটাইমার’ যদি দল ছাড়েন, তবে তা সার্বিকভাবে বাঙালি মুসলিম সমাজে নেতিবাচক বার্তা দেবে। দলের এক নেতার আক্ষেপ, ‘আমরা যে শ্রেণির কথা বলি, প্রতীক সেই অংশ থেকে উঠে আসা নেতা। তাঁকে ধরে রাখতে দল সক্রিয় হবেই। কিন্তু আরও আগে এই সক্রিয়তা দেখালে পরিস্থিতি হয়তো এতটা জটিল হত না।’

সিপিএমের বিভিন্ন দলিলে বারবার ‘মধ্যবিত্ত মানসিকতা’ বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে। সেখানে প্রতীক উর ছিলেন ব্যতিক্রমী এক উদাহরণ, যিনি স্ত্রী-সন্তান নিয়ে প্রতিদিন চরম আর্থিক সঙ্কটের সঙ্গে যুঝে রাজনীতি করেন। রামচন্দ্র ডোম, দেবলীনা হেমব্রম বা নিরাপদ সরদারের মতো হাতেগোনা কয়েকজনকে বাদ দিলে প্রতীকের মতো প্রান্তিক নেতার আকাল রয়েছে দলের প্রথম সারিতে। তাই তাঁর বিদায়ে বড় ক্ষতির মেঘ দেখছেন নিচুতলার অনেক কর্মী।

ইতিহাস বলছে, গত আড়াই দশকে সইফুদ্দিন চৌধুরী, মইনুল হাসান বা আব্দুস সাত্তারদের মতো সংখ্যালঘু উচ্চনেতারা সিপিএম ছেড়েছেন। মইনুলরা যখন মুর্শিদাবাদের মতো জেলায় মুসলিম জেলা সম্পাদকের পক্ষে সওয়াল করেছিলেন, তখন তাকে ‘সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি’ আখ্যা দেওয়া হয়েছিল। যদিও আজ সেই পথেই হাঁটতে হচ্ছে দলকে। এমনকি দক্ষিণ ২৪ পরগনার একদা ডাকাবুকো নেতা রেজ্জাক মোল্লাও দল ছেড়ে তৃণমূলে গিয়ে মন্ত্রী হয়েছিলেন। প্রতীক উর কী করবেন? দলবদলের জল্পনা উড়িয়ে তাঁর ঘনিষ্ঠরা বলছেন, দলের একাংশ তাঁর ওপর স্নায়ুর চাপ তৈরি করতে চাইছে। তবে রাজনীতি মানেই যে ‘সম্ভাবনার শিল্প’, তাও মনে করিয়ে দিচ্ছেন তাঁরা। প্রতীকের এই ‘বিদ্রোহ’ এখন আলিমুদ্দিনের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের বড় পরীক্ষা।

READ MORE.....