ওপার বাংলায় হিংসার আগুন নেভার লক্ষণ নেই। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকেই যে অশান্তির সূত্রপাত, তা এখন সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের জন্য প্রাণঘাতী হয়ে দাঁড়িয়েছে। ছাত্রনেতা শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুর পর থেকে ভারত-বিরোধী জিগির নতুন মাত্রা পেয়েছে। আর তার সরাসরি কোপ পড়ছে বাংলাদেশের সাধারণ হিন্দুদের ওপর। একের পর এক নৃশংস হত্যাকাণ্ড, লুটপাট আর নারী নির্যাতনের ঘটনায় বর্তমানে রীতিমতো ‘মৃত্যু উপত্যকায়’ পরিণত হয়েছে ওপার বাংলার জনপদ। গত কয়েক সপ্তাহে ময়মনসিংহ থেকে যশোর, সর্বত্রই ঝরছে সংখ্যালঘু রক্ত। আতঙ্কের প্রহর গুনছেন বাংলাদেশের প্রায় সোয়া এক কোটি হিন্দু নাগরিক।
সাম্প্রতিক হিংসার ভয়াবহতা সব সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছে ময়মনসিংহে। সেখানে ২৫ বছর বয়সি পোশাক শ্রমিক দীপু চন্দ্র দাসকে যে ভাবে পিটিয়ে এবং জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়েছে, তা মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেও হার মানায়। গত ১৮ ডিসেম্বর উত্তেজিত জনতা প্রথমে তাঁকে বেধড়ক মারধর করে এবং পরে গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। এই নৃশংসতা কেবল বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। রাজবাড়ীর পাংশায় অমৃত মণ্ডল নামে এক যুবককে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। যদিও পুলিশের দাবি, ওই যুবকের বিরুদ্ধে পুরনো অপরাধের রেকর্ড ছিল। কিন্তু বিচার ব্যবস্থার তোয়াক্কা না করে প্রকাশ্য রাস্তায় পিটিয়ে মারার এই সংস্কৃতি সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
যশোরের মণিরামপুরেও রক্ত ঝরেছে। সোমবার দুপুরে সেখানে বরফকল ব্যবসায়ী রাণাপ্রতাপ বৈরাগীকে প্রকাশ্য বাজারে কুপিয়ে ও মাথায় গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। দুষ্কৃতীরা তাঁকে তাঁর নিজের কারখানার পাশেই একটি গলিতে ডেকে নিয়ে যায়। খুব কাছ থেকে মাথায় গুলি করার পর তাঁর গলা কেটে দেওয়া হয়। রাণাপ্রতাপ কেবল ব্যবসায়ী ছিলেন না, তিনি একটি স্থানীয় সংবাদপত্রের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের দায়িত্বও সামলাচ্ছিলেন। নরসিংদীতেও প্রায় একই কায়দায় খুন করা হয়েছে মুদি ব্যবসায়ী শরৎ চক্রবর্তীকে। সোমবার রাতে দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফেরার সময় তাঁর মাথার পেছনে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপ বসায় আততায়ীরা। আশ্চর্যের বিষয় হলো, মৃত্যুর কয়েক দিন আগেই শরৎ ফেসবুকে লিখেছিলেন, তাঁর মাতৃভূমি এখন মৃত্যু উপত্যকা হয়ে উঠেছে। সেই আশঙ্কাই শেষ পর্যন্ত সত্যি হলো।
কেবল প্রাণহানি নয়, বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নারীদের ওপর নির্যাতনের খবরও এখন নিত্যনৈমিত্তিক। ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে এক হিন্দু বিধবাকে গণধর্ষণের পর গাছে বেঁধে অমানবিক অত্যাচারের খবর পাওয়া গিয়েছে। স্থানীয় সূত্রে খবর, গত ৩১ ডিসেম্বর রাতে চার দুষ্কৃতী ওই মহিলার ঘরে ঢুকে তাঁকে ধর্ষণ করে। এরপর তাঁকে ও তাঁর দুই আত্মীয়কে বাড়ির বাইরে এনে গাছে বেঁধে মারধর করা হয়। এমনকি ওই মহিলার চুলও কেটে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ। নির্যাতিতা দীর্ঘক্ষণ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পর থানায় অভিযোগ দায়ের করতে পেরেছেন। পুলিশ চার অভিযুক্তের মধ্যে মাত্র একজনকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে।
২০২২ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, বাংলাদেশে হিন্দু জনসংখ্যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৭.৯৫ শতাংশ। অর্থাৎ প্রায় ১ কোটি ৩১ লক্ষ ৩০ হাজার হিন্দু নাগরিকের নিরাপত্তা এখন চরম সঙ্কটে। শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পর থেকেই মঠ-মন্দির ভাঙচুর ও হিন্দুদের বেছে বেছে নিগ্রহ করার অভিযোগ উঠছে। হাদি হত্যাকাণ্ডের পর থেকে এই ভারত-বিরোধী জিগিরকে হাতিয়ার করে মৌলবাদী শক্তিগুলো হিন্দুদের ওপর আক্রমণ আরও তীব্র করেছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে শান্তির বার্তা দেওয়া হলেও বাস্তবে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে সংখ্যালঘু পরিবারগুলো। ভিটেমাটি হারানোর ভয় আর প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে এক চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটছে পদ্মাপাড়ের এই মানুষদের।














