ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা ‘এসআইআর’ ঘিরে সাধারণ মানুষের ভোগান্তির দায় শেষমেশ রাজ্য সরকারের ঘাড়েই চাপালেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। মঙ্গলবার কৃষ্ণনগরের ধুবুলিয়ায় আয়োজিত ‘পরিবর্তন সংকল্প সভা’ থেকে তিনি সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিশানা করেন। শুভেন্দুর দাবি, রাজ্য সরকার পর্যাপ্ত ডেটা এন্ট্রি অপারেটর না দেওয়ার ফলেই শুনানিতে সাধারণ মানুষকে লাইনে দাঁড়িয়ে হেনস্থা হতে হচ্ছে। এই অব্যবস্থার জন্য নির্বাচন কমিশন নয়, বরং তৃণমূল সরকারই দায়ী বলে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, ভুয়ো ভোটার ও অনুপ্রবেশকারীদের আড়াল করতেই সরকার কমিশনকে অসহযোগিতা করছে।
পাল্টা জবাবে তৃণমূল এই অভিযোগকে ‘ড্যামেজ কন্ট্রোল’ বলে কটাক্ষ করেছে। এসআইআর-এর শুনানি প্রক্রিয়ায় দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে বৃদ্ধ ও বিশেষভাবে সক্ষম ব্যক্তিরা অসুস্থ হয়ে পড়ছেন বলে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অভিযোগ উঠছিল। এই পরিস্থিতিকে হাতিয়ার করেই এদিন আক্রমণাত্মক মেজাজে ধরা দেন শুভেন্দু। তিনি বিহারের উদাহরণ টেনে বলেন, ‘বিহারে যখন এসআইআর হয়, তখন সেই রাজ্যের সরকার সব রকমের সহযোগিতা করেছিল। চার মাসের জন্য এক হাজার ডেটা এন্ট্রি অপারেটর দিয়েছিল’।
বাংলার ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন দাবি করে তিনি বলেন, এসআইআর শুরু হতেই নির্বাচন কমিশন এবং তার সিইও বাংলার সরকারকে চিঠি লিখে, এক হাজার ডেটা এন্ট্রি অপারেটর চেয়েছিল। মাত্র ৪ থেকে ৫ কোটি টাকা খরচ হতো। কিন্তু বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী, ভুয়ো ভোটারদের বাঁচাতে রাজ্য সরকার ডেটা এন্ট্রি অপারেটর দেয়নি। তার জন্যই কিছু কারও নামের বানানে ভুল হয়েছে’। নির্বাচন কমিশনের পদক্ষেপকে সমর্থন জানিয়ে শুভেন্দু এদিন বিতর্কিত মন্তব্যও করেন। কমিশনকে কার্বলিক অ্যাসিডের সঙ্গে তুলনা করে তিনি বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন গর্তে কার্বলিক অ্যাসিড ঢেলে দিয়েছে।
যত বাংলাদেশি মুসলিম, অবৈধ অনুপ্রবেশকারী, রোহিঙ্গা ছিল, সব কিলবিল করে বেরোচ্ছে’। সাধারণ মানুষের সাময়িক অসুবিধার কথা মেনে নিয়েও তিনি দায় ঝেড়ে ফেলে বলেন, ‘হ্যাঁ কিছু ভারতীয়র অসুবিধা হচ্ছে। কিন্তু এর জন্য দায়ী নির্বাচন কমিশন নয়। দায়ী তৃণমূল সরকার’। শুভেন্দুর অভিযোগ, তৃণমূল পরাজয় নিশ্চিত জেনে ইচ্ছাকৃতভাবে রাজ্যে নৈরাজ্য সৃষ্টির চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, ‘এই সব বলে কখনও জাতীয় সড়ক অবরোধ করছে, কখনও বিডিও অফিসে ভাঙচুর করছে। আসলে বাংলা জুড়ে নৈরাজ্য সৃষ্টি করতে চাইছে তৃণমূল’। অন্যদিকে, বেলডাঙার সাম্প্রতিক অশান্তি নিয়েও সুর চড়ান বিরোধী দলনেতা। হিন্দুদের একজোট হওয়ার ডাক দিয়ে তিনি অভিযোগ করেন, সিমি বা পিএফআই-এর মতো নিষিদ্ধ সংগঠনগুলি তৃণমূলের মদতে সেখানে সন্ত্রাস চালিয়েছে। তিনি বলেন, ‘রেল, জাতীয় সড়ক অবরোধ করে উত্তরের সঙ্গে দক্ষিণের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল। আজ আমার করা মামলায় কলকাতা হাইকোর্ট প্যারামিলিটারি ফোর্স মোতায়েনের কথা বলেছে। দরকারে এনআইএ তদন্তের কথাও বলা হয়েছে। তাই এ বার পরিবর্তন চাই’।
বক্তব্যের এক পর্যায়ে তিনি বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের পরিস্থিতির সঙ্গে ওপার বাংলার তুলনাও টেনে আনেন। শুভেন্দুর এই সমস্ত অভিযোগ অবশ্য গুরুত্ব দিতে নারাজ শাসকদল। তৃণমূলের মুখপাত্র জয়প্রকাশ মজুমদার পাল্টা প্রশ্ন তুলে বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন কবে সাংবাদিক সম্মেলন করে বলল, যে ডেটা এন্ট্রি অপারেটর দেওয়া হয়নি বলে তাঁদের অসুবিধা হচ্ছে? বরং তাঁরা তো এসআইআর-এর কাজ ভালো চলছে বলেই বারবার জানিয়েছেন’।
জয়প্রকাশের দাবি, সাধারণ মানুষ বিজেপি এবং কমিশনের ওপর ক্ষুব্ধ। সেই জনরোষ থেকে বাঁচতেই শুভেন্দু এখন মিথ্যে অভিযোগ করছেন। তাঁর কটাক্ষ, ‘এ সব ড্যামেজ কন্ট্রোলের চেষ্টা। সাধারণ মানুষ নিত্যদিন বিজেপি আর কমিশনকে তুলোধনা করছেন বলে এখন শাক দিয়ে মাছ ঢাকতে চাইছেন’। ২০০২ সালকে ভিত্তি বছর ধরে চলা এই এসআইআর প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে এখন সরগরম বাংলার রাজনীতি।














