রাজ্য রাজনীতিতে বাম-কংগ্রেস জোটের ভবিষ্যৎ নিয়ে শুরু হয়েছে তীব্র চাপানউতোর। মহম্মদ সেলিমের এক সাম্প্রতিক মন্তব্যকে কেন্দ্র করে উত্তাল আলিমুদ্দিন থেকে বিধান ভবন। সিপিএমের রাজ্য সম্পাদকের বিরুদ্ধে সরাসরি ‘ঘর ভাঙানোর হুমকি’ দেওয়ার অভিযোগ আনল প্রদেশ কংগ্রেস। এমনকি, সেলিমের নিজের দলের অন্দরেই তাঁর ‘কমিউনিস্টত্ব’ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বলে দাবি করেছে হাত শিবির। এই বেনজির আক্রমণে কার্যত পঞ্চায়েত নির্বাচনের আগে জোটের সমীকরণ বড়সড় ধাক্কা খেল বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
তৃণমূল ও বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াই জোরদার করতে ব্লক ও বুথ স্তরের কংগ্রেস কর্মীদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার বার্তা দিয়েছিলেন মহম্মদ সেলিম। তাঁর এই অবস্থানকে ‘বন্ধুত্বপূর্ণ’ নয়, বরং আগ্রাসী মনোভাব হিসেবে দেখছে কংগ্রেস। প্রদেশ কংগ্রেস মুখপাত্র অশোক ভট্টাচার্য সরাসরি সমাজমাধ্যমে তোপ দেগেছেন সেলিমের বিরুদ্ধে। অশোকের সাফ কথা, জোট না করলে মহম্মদ সেলিম কংগ্রেসের ঘর ভাঙানোর হুমকি দিয়েছেন। কেবল বলব, নিজের ঘরে আপনি যে আগুন লাগিয়েছেন, তা পারলে নেভান। আমাদের কাছে সব খবর আছে। অশোকের এই মন্তব্যে আলিমুদ্দিনের অভ্যন্তরীণ ফাটলই যেন প্রকাশ্যে চলে এল।
সম্প্রতি জন উন্নয়ন পার্টির নেতা হুমায়ুন কবীরের সঙ্গে সেলিমের একটি গোপন বৈঠক ঘিরে বিতর্কের সূত্রপাত। ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটের আগে যে হুমায়ুন মুর্শিদাবাদে সাম্প্রদায়িক উস্কানিমূলক মন্তব্য করেছিলেন এবং ইদানীং বিজেপির সঙ্গে সমঝোতার ইঙ্গিত দিচ্ছেন, তাঁর সঙ্গে সেলিমের বৈঠক দলের নিচুতলার কর্মীরা মানতে পারছেন না। অশোক ভট্টাচার্য সেই প্রসঙ্গ টেনেই দাবি করেছেন, সিপিএমের ছাত্র-যুব সংগঠনের কর্মীরাই এখন সেলিমের আদর্শ নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। কংগ্রেস মুখপাত্র আরও জানিয়েছেন যে, সেলিমের এই মন্তব্যের জবাব দলের শীর্ষ নেতৃত্ব নয়, সাধারণ কর্মীরাই দেবেন।
মহম্মদ সেলিম অবশ্য তাঁর অবস্থানে অনড়। একটি টিভি সাক্ষাৎকারে তিনি স্পষ্ট জানিয়েছিলেন, শুভঙ্কর সরকারের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় না থেকে জেলা ও ব্লকের বাম কর্মীদের উচিত বুথ স্তরের কংগ্রেস কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করা। সেলিমের যুক্তি ছিল, যে কংগ্রেস কর্মীরা তৃণমূলের মার খেয়েও দল ছাড়েননি, তাঁদের তিনি শ্রদ্ধা করেন। তিনি বলেছিলেন, তৃণমূল নেতৃত্বের সঙ্গে যদি কংগ্রেসের ব্যবসায়িক বা বাণিজ্যিক বা রাজনৈতিক সম্পর্ক হয়, তারজন্য এঁরা কেন কো-ল্যাটারেল ড্যামেজ হবেন? সেলিমের এই মন্তব্যের মধ্যেই দল ভাঙানোর ইঙ্গিত খুঁজে পেয়েছে কংগ্রেস।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সেলিম আদতে কংগ্রেসের নিচুতলার কর্মীদের নিজেদের দিকে টেনে আনতে চাইছেন। সেলিম নিজেই বলেছিলেন, এরপরে কিন্তু বলতে পারবেন না যে, আমি দল ভাঙাচ্ছি। কিন্তু সেই ব্যাখ্যা মানতে নারাজ বিধান ভবন। বরং তারা মনে করছে, জোটের দোহাই দিয়ে সিপিএম কৌশলে কংগ্রেসের সংগঠন দুর্বল করার চেষ্টা করছে। একদিকে আলিমুদ্দিনের অন্দরে হুমায়ুন-যোগ নিয়ে অস্বস্তি, আর অন্যদিকে জোটসঙ্গীর কড়া আক্রমণ— দুইয়ের যাঁতাকলে পড়ে বঙ্গ সিপিএমের অস্বস্তি এখন তুঙ্গে। শেষ পর্যন্ত এই তরজা জোটের ভবিষ্যৎ কোন পথে নিয়ে যায়, সেটাই এখন দেখার। ফাইল ফটো।












