বাতাসে বিষ মেশে কী করে?
দীপাবলির সময়ে বায়ুদূষণের পিছনে একাধিক কারণ কাজ করে।
আতশবাজির ধোঁয়া: বাজি পোড়ালে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে পিএম ২.৫ এবং পিএম ১০-এর মতো সূক্ষ্ম কণা। এগুলি শ্বাসের সঙ্গে শরীরে ঢুকে শ্বাসনালিতে জ্বালা ও প্রদাহ তৈরি করতে পারে।
যানবাহনের ধোঁয়া: উৎসবের সময়ে রাস্তায় গাড়ির সংখ্যা বাড়ে। জ্বালানি পোড়ানোর ফলে নির্গত দূষিত পদার্থ বাতাসের গুণমান আরও খারাপ করে।
অন্যান্য দূষণের উৎস: কলকারখানার ধোঁয়া, আবর্জনা পোড়ানো এবং বাড়ির ভিতরে ধূপ-ধুনো বা অন্যান্য ধোঁয়ার উৎসও সামগ্রিক দূষণের মাত্রা বাড়ায়।
দূষণ কীভাবে ফুসফুসের ক্ষতি করে?
দূষিত বাতাসে থাকা সূক্ষ্ম কণা শ্বাসের সঙ্গে শরীরে প্রবেশ করে শ্বাসনালির স্বাভাবিক কার্যকারিতায় বাধা সৃষ্টি করতে পারে। প্রথম দিকে চোখ, নাক ও গলায় জ্বালা, কাশি বা গলা খুসখুসের মতো সমস্যা দেখা যায়। পরে শ্বাসের সঙ্গে সাঁইসাঁই শব্দ, বুকে চাপ এবং শ্বাস নিতে অসুবিধা হতে পারে।
বিশেষ করে হাঁপানির রোগীদের শ্বাসনালি আগে থেকেই সংবেদনশীল থাকে। ফলে বাজির ধোঁয়া তাঁদের শ্বাসনালিকে আরও সঙ্কুচিত করে দিতে পারে। সিওপিডি-তে আক্রান্তদের ক্ষেত্রেও শ্বাসকষ্ট বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। বারবার বা দীর্ঘদিন দূষিত বাতাসের সংস্পর্শে থাকলে ফুসফুসের কার্যক্ষমতার উপরও বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে।
শরীরের কোন লক্ষণগুলি অবহেলা করবেন না?
দূষণের প্রভাবে কয়েকটি উপসর্গ দেখা দিতে পারে। যেমন-
- একটানা কাশি বা গলা খুসখুস করা।
- শ্বাস নেওয়ার সময়ে সাঁইসাঁই শব্দ।
- বুকে চাপ বা অস্বস্তি।
- অল্প পরিশ্রমেই হাঁপিয়ে ওঠা।
- শ্বাস নিতে অসুবিধা।
- অস্বাভাবিক ক্লান্তি বা মাথা ঘোরা।
আগে থেকে শ্বাসযন্ত্রের অসুখ থাকলে এই লক্ষণগুলি দ্রুত বাড়তে পারে। তাই উপসর্গ দেখা দিলে নিজে থেকে ওষুধ না খেয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
বাজির ধোঁয়া থেকে ফুসফুস বাঁচাবেন কীভাবে?
বাইরে বেরলে এন ৯৫ মাস্ক: দূষিত বাতাসে বেরনো এড়ানো সম্ভব না হলে এন-৯৫ বা সমমানের মাস্ক ব্যবহার করুন। নাক ও মুখ সম্পূর্ণ ঢাকা থাকা জরুরি। সাধারণ কাপড়ের মাস্ক অতি সূক্ষ্ম দূষিত কণা আটকাতে যথেষ্ট কার্যকর নয়।
বাজি পোড়ানোর সময় বাইরে নয়: বাজি পোড়ানোর সময়ে খোলা জায়গায় থাকা বা অকারণে বাইরে ঘোরাঘুরি এড়িয়ে চলুন।
দরজা-জানলা বন্ধ রাখুন: বাতাসে দূষণের মাত্রা বেশি থাকলে জানলা-দরজা বন্ধ রাখুন।
একিউআই দেখে দিনের কাজ ঠিক করুন: বাইরে বেরনোর আগে এলাকার বায়ুর গুণমান সূচক (একিউআই) দেখে নিন। দূষণের মাত্রা বেশি থাকলে প্রাতঃভ্রমণ, দৌড়নো বা খোলা জায়গায় শরীরচর্চা বন্ধ রাখুন।
ঘরের বাতাসও পরিষ্কার রাখুন: সম্ভব হলে এইচইপিএ ফিল্টারযুক্ত এয়ার পিউরিফায়ার ব্যবহার করুন। ঘরের ভিতরে ধূমপান, ধূপ-ধুনো বা অন্য কোনও কারণে ধোঁয়া উৎপন্ন হয়, এমন কাজ এড়িয়ে চলুন। পিউরিফায়ারের ফিল্টার নিয়মিত পরিষ্কার বা পরিবর্তন করতে হবে।
শিশু ও প্রবীণদের নিয়ে বাড়তি সতর্কতা
দূষণের প্রভাব শিশু, প্রবীণ এবং আগে থেকে ফুসফুসের অসুখে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে বেশি হতে পারে। তাই তাঁদের বাজির ধোঁয়া থেকে দূরে রাখুন। হাঁপানি বা সিওপিডির রোগীদের চিকিৎসকের দেওয়া ওষুধ ও ইনহেলার হাতের কাছে রাখা জরুরি। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নির্ধারিত ওষুধ বন্ধ করবেন না। সম্ভব হলে বাজি এড়িয়ে বিকল্প উপায়ে উৎসব পালন করুন।
খাবার, জল ও শরীরচর্চায় নজর
ফলমূল ও শাকসবজি-সহ সুষম খাবার খান। পর্যাপ্ত জল পান করুন, যাতে শরীরের স্বাভাবিক আর্দ্রতা বজায় থাকে। শ্বাসের ব্যায়াম কারও কারও ক্ষেত্রে উপকারী হতে পারে, তবে তা নিজের শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে করা উচিত। মনে রাখতে হবে, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন ফুসফুসের সুস্থতা বজায় রাখতে সাহায্য করলেও দূষিত বাতাসের ক্ষতি থেকে সম্পূর্ণ সুরক্ষা দিতে পারে না।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
কাশি না কমলে, শ্বাসের সঙ্গে সাঁইসাঁই শব্দ হলে, বুকের অস্বস্তি বা শ্বাসকষ্ট বাড়লে বক্ষরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। শ্বাস নিতে তীব্র কষ্ট, ঠোঁট নীলচে হয়ে যাওয়া, বিভ্রান্তি বা একটানা বুকে ব্যথা হলে অপেক্ষা না করে জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে
দীপাবলির আলোয় ঘর সাজুক, উৎসব হোক আনন্দের। কিন্তু সেই আনন্দের মাশুল যেন দিতে না হয় ফুসফুসকে। একটু সচেতনতা, কিছু প্রয়োজনীয় সতর্কতা আর সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ- এই তিনেই অনেকটা নিরাপদ রাখা সম্ভব শ্বাসযন্ত্রকে।














