বাংলা সাহিত্যের জগতে অনুবাদ বা তর্জমার গুরুত্ব অপরিসীম। বিশ্বসাহিত্যের বিশাল ও বৈচিত্র্যময় আঙিনাকে বাংলাভাষী পাঠকের দরবারে পৌঁছে দেওয়ার কাজে যাঁরা সারা জীবন অনন্য অবদান রেখে গেছেন, তাঁদের মধ্যে মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ২০২০ সালের ৪ আগস্ট করোনা মহামারীর অত্যন্ত কঠিন ও সংকটময় সময়ে আমরা এই মহান শিক্ষক, প্রাবন্ধিক, কবি ও তর্জমাকারকে হারিয়েছিলাম। আজ, ২০২৬ সালের ৪ আগস্ট, এই বিশেষ দিনে তাঁর ষষ্ঠ প্রয়াণদিবসে তাঁকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা, সম্মান ও গভীর ভালবাসার সঙ্গে আমরা সবাই স্মরণ করছি। তিনি কেবল একজন সাধারণ অনুবাদক ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন এমন এক অনন্য সাহিত্যসাধক যিনি বাংলা ভাষার সীমানা পার করে বিশ্বসাহিত্যের আলো ও আনন্দ আমাদের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছিলেন।
মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবন ও দীর্ঘ সাহিত্যসাধনার এক বিরাট অংশ জুড়েই ছিল তর্জমা। তবে অনুবাদ কথাটির চেয়ে ‘তর্জমা’ শব্দটি ব্যবহার করতে তিনি নিজেই বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ করতেন। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগের মেধাবী ছাত্র হিসেবে সাহিত্যযাত্রার শুরুতেই তিনি পেয়েছিলেন খ্যাতনামা সাহিত্যিক বুদ্ধদেব বসুর স্নেহ ও গুরুত্বপূর্ণ উপদেশ। প্রিয় গুরুর অনুপ্রেরণায় ও নির্দেশনায় তরুণ বয়সেই তিনি অনুবাদ করেন নোবেলজয়ী সাহিত্যিক বোরিস পাস্তেরনাকের বিশ্বখ্যাত উপন্যাস ‘ডক্টর জিভাগো’। তাঁর এই অনন্য কাজ তৎকালীন সাহিত্যপ্রেমী মানুষের মনে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল। এরপর থেকে আর তাঁকে কখনোই পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। একের পর এক আন্তর্জাতিক মানের রত্নসম সাহিত্য তিনি অত্যন্ত সহজ ও সাবলীল বাংলায় রূপান্তর করে বাংলা সাহিত্যের ভাণ্ডারকে চিরতরে সমৃদ্ধ করে গেছেন।
বাঙালি পাঠককে লাতিন আমেরিকার কালজয়ী সাহিত্যের সঙ্গে নতুনভাবে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার মূল কৃতিত্ব তাঁরই। নোবেলবিজয়ী কলম্বীয় লেখক গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের নাম বাঙালি সমাজে পরিচিত হওয়ার বহু আগেই মানবেন্দ্রবাবু তাঁর লেখাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে যুক্ত করেছিলেন। তিনি বাংলায় অত্যন্ত সুন্দরভাবে তর্জমা করেছিলেন মার্কেসের বিখ্যাত উপন্যাস ‘কর্নেলকে কেউ চিঠি লেখে না’ এবং ‘সরল এরেন্দিরা ও তার বিবেকহীন দিদিমার গল্প’। এ ছাড়া মার্কেসের নোবেল প্রাপ্তির ঐতিহাসিক ভাষণটিও তিনি নিপুণভাবে বাংলায় রূপান্তর করেন। তাঁর হাত ধরেই মেক্সিকোর বিশ্বখ্যাত লেখক হুয়ান রুলফোর একমাত্র উপন্যাস ‘পেদ্রো পারামো’ এবং তাঁর গল্পগুলো বাংলার পাঠকরা নতুন স্বাদে পড়ার সুযোগ পান। চিলির কবি পাবলো নেরুদার নাটক ও বিখ্যাত কবিতা অনুবাদ করেও তিনি ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করেন।
মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় শুধু লাতিন আমেরিকার সাহিত্যেই তাঁর কাজ সীমাবদ্ধ রাখেননি। পোল্যান্ডের নোবেলজয়ী কবি ভিসোওয়াভা সিম্বোর্স্কার কবিতাও তিনি বাংলায় তর্জমা করেন। গম্ভীর ও কালজয়ী সাহিত্যের পাশাপাশি শিশু সাহিত্য, দেশি-বিদেশি কমিকস, এমনকি টেস্ট ক্রিকেটের সুন্দর ও মজার ইতিহাস নিয়েও তাঁর ছিল গভীর আগ্রহ ও কালজয়ী অনন্য কাজ। তাঁর লেখার ধরন ছিল অত্যন্ত সহজ, স্বতঃস্ফূর্ত ও মনছুঁয়ে যাওয়া। কোনো কঠিন বা জটিল শব্দ ব্যবহার না করে সাধারণ মানুষের ভাষায় কত গভীর ভাবনা প্রকাশ করা যায়, তা তাঁর তর্জমা পড়লেই বেশ সহজে বোঝা যায়। মূল বইয়ের মূল ভাব ও আবেগ পুরোপুরি অক্ষুণ্ণ রেখে যেভাবে তিনি বাংলায় তা ফুটিয়ে তুলতেন, তা সত্যিই বিরল।
তাঁর প্রয়াণের ছয় বছর পরেও তাঁর সৃষ্টি ও অবদান আমাদের সাহিত্যচর্চায় একইভাবে উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে। খ্যাতনামা লেখক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মতে, দেশবিদেশের সমস্ত সাহিত্য ও খবরাখবর ছিল মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের একদম নখদর্পণে। বিশ্বসাহিত্যের এক মস্ত জানলা তিনি আমাদের জন্য খুলে দিয়েছিলেন, যার ভেতর দিয়ে বাঙালি পাঠক বহু দেশের অজানা সংস্কৃতির মিষ্টি স্বাদ পেয়েছিল। আজ তাঁর এই প্রয়াণদিবসে আমাদের একটাই আন্তরিক প্রার্থনা, তাঁর রেখে যাওয়া অমূল্য সাহিত্য যেন আগামী দিনের সমস্ত নতুন পাঠক ও তরুণ লেখকদের সঠিক পথ দেখায়। বিশ্বসাহিত্যের বিশ্বজোড়া আলো ছড়িয়ে দেওয়ার এই গুণী ও নির্লোভ মানুষটিকে আমরা চিরদিন আমাদের গভীর শ্রদ্ধায়, সম্মানে ও সত্যিকারের ভালোবাসায় স্মরণের সারণিতে বাঁচিয়ে রাখব।














