কালীপুজোর আগমনী সুর বাজতেই নবদ্বীপের দক্ষ শিল্পীদের ব্যস্ততা তুঙ্গে। খাঁড়া তৈরির কাজ যেন রাতদিন এক হয়ে যায়। হাতুড়ির টুকটাক এবং ধাতব ঝংকারে মুখরিত অধিকারী পরিবারের কর্মশালা এই দৃশ্যই যেন নবদ্বীপের ঐতিহ্যের এক অমোঘ প্রতীক।
রাজু অধিকারী, নবদ্বীপের অন্যতম অভিজ্ঞ খাঁড়া শিল্পী। তাঁর ভাষায়,এ কাজ আমাদের রক্তে। আমার পূর্বপুরুষেরা যেমন করতেন, আমরাও সেই ঐতিহ্য বয়ে চলেছি। বংশপরম্পরায় এই শিল্প তাদের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বলেই, কঠিন পরিস্থিতিতেও তাঁরা কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
রাজুবাবু বলেন, দিনে দিনে কাঁচামালের দাম বাড়ছে। লোহার পাত, কাঠ, রং সবকিছুরই দাম আকাশছোঁয়া। কিন্তু বাজারে খাঁড়ার দাম সেই অর্থে বাড়ানো যাচ্ছে না। ফলে আয় কমে এসেছে নজরকাড়া রকমে। তবু হাল ছাড়েননি তাঁরা। কারণ এই শিল্পই তাঁদের জীবনধারণের একমাত্র ভরসা। রাজ্যের অনান্য স্থানে যেখানে কাজের অভাব, সেখানে এই পুরনো ঐতিহ্যই তাঁকে ও তাঁর সহকর্মীদের টিকিয়ে রেখেছে।
দুর্গাপুজো, কালীপুজো, কার্তিক পুজো ও রাস উৎসব সব ক্ষেত্রেই নবদ্বীপের তৈরি খাঁড়ার বিশেষ চাহিদা থাকে। শুধু খাঁড়াই নয়, দেবী-দেবতার নানা অস্ত্র, মুণ্ডমালা, শাঁখ বা ত্রিশূলও তাঁরা অপরিসীম দক্ষতায় তৈরি করেন। এই দক্ষতা আজ নদিয়া জেলার গণ্ডি ছাড়িয়ে সারা রাজ্যে পরিচিত।
রাজু অধিকারীর কথায়, এখন খাঁড়ার অর্ডার আসে না শুধু রাজ্যের বিভিন্ন জেলা থেকে, আসে ভিনরাজ্য ও বিদেশ থেকেও। বিদেশে নিবেদিতপ্রাণ বাঙালিরা পুজোর জন্য নবদ্বীপের খাঁড়া পৌঁছতে চায় নিজের হাতে তৈরি শিল্পপণ্যের সেই ঐতিহ্যবাহী স্পর্শটি পেতে।
এই বাড়তি অর্ডারের জেরে শিল্পীদের মনোবল অনেক বেড়েছে। পুজোর মরশুমে কারিগররা ঘুম ভুলে, প্রায় নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করেন। রাজুবাবু বললেন,রাত জেগে কাজ করলেও আমাদের শান্তি আছে। তবে সংকটও আছে। কাঁচামালের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা, আর প্রযুক্তিগত সহায়তার অভাব সব মিলিয়ে শিল্প টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে উঠছে। অনেক তরুণ এই কাজে আসতে চাইছে না, কারণ আয়ের নিশ্চয়তা নেই। অথচ এই ঐতিহ্যের ধারাই ফিরিয়ে আনতে পারে নবদ্বীপের পুরনো গৌরব।
আজ নবদ্বীপের প্রশাসন থেকে স্থানীয় বাসিন্দা সবাই চায় এই ঐতিহ্য টিকে থাকুক নতুন প্রজন্মের হাতে। সকলে একসুরে বলছেন, অধিকারী পরিবারের হাতে গড়া খাঁড়া শুধু এক সৃষ্টি নয়, সেটি বাংলার সংস্কৃতির প্রতীক।















