তারাপীঠের বিদেশিনী হোটেলে আগুন লেগে ৯ জনের মৃত্যুর ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই খাস কলকাতা শহরে নিউমার্কেটের হোটেলে আগুন লেগে মৃত্যু হলো ৯ জনের। এক শিশুসহ মৃত ৯ জনের মধ্যে ৮ জন বাংলাদেশ নাগরিক বলে প্রাথমিকভাবে জানা গিয়েছে। তারা চিকিৎসার জন্য কলকাতায় এসেছিলেন বলে জানা গিয়েছে বাংলাদেশের ডেপুটি হাইকমিশন সূত্রে। ন’জনের মধ্যে আট জন বাংলাদেশি। বাকি একজন হোটেলের কর্মী সন্দীপ পাসওয়ান(১৯), যিনি ঝাড়ণ্ডের বাসিন্দা। কলকাতায় অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানির খবর শুনে অত্যন্ত মর্মাহত প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিজের এক্স হ্যান্ডলে পোস্ট করেন, ‘দুর্ঘটনায় যাঁরা তাঁদের প্রিয়জনকে হারিয়েছেন, তাঁদের প্রতি আমার সমবেদনা। আহতরা যেন দ্রুত আরোগ্য লাভ করেন।’
তারাপীঠের পর এবার খাস কলকাতায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড। নিউ মার্কেট থানার অন্তর্গত ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের একটি হোটেলে আচমকাই আগুন লাগে। আগুনের ভয়াবহতায় হোটেলের ভিতরে আটকে পড়ে একাধিক মানুষ। ঘটনায় ঝলসে কমপক্ষে ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে। এছাড়াও ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ৬ জন। মৃতদের মধ্যে ছ’জন পুরুষ, দু’জন মহিলা একটি শিশুও রয়েছে। জানা গিয়েছে কানের চিকিৎসার জন্য কলকাতায় এসেছিল ওই শিশুটি। আগুন লাগার খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছয় দমকল বাহিনী ও বিপর্যয় মোকাবিলা দল। কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের প্রাথমিক তদন্তের রিপোর্টে উঠে এসেছে অগ্নিকাণ্ডের সেই ভয়াবহ চিত্র। চিকিৎসকদের মতে, অগ্নিকাণ্ডের পর ছড়িয়ে পড়া ঘন ধোঁয়া দ্রুত ঘরে আটকে থাকা মানুষদের শ্বাসনালীর মধ্য দিয়ে ফুসফুসে প্রবেশ করে।
এই ধোঁয়ার সঙ্গেই দেহে ঢুকতে থাকে মারাত্মক কার্বন মনোক্সাইড গ্যাস। শরীরে প্রবেশ করার পরেই এই কার্বন মনোক্সাইড গ্যাস দ্রুত রক্তের সঙ্গে মিশে যায়। এরপর রক্তে থাকা হিমোগ্লোবিনের সঙ্গে রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটিয়ে তৈরি করে ‘কার্বক্সিহিমোগ্লোবিন’। কার্বক্সিহিমোগ্লোবিন তৈরি হওয়ার ফলে রক্তের স্বাভাবিক অক্সিজেন বহনের ক্ষমতা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়। শরীরে অক্সিজেনের চরম ঘাটতি তৈরি হওয়ায় আর কোনও বিকল্প থাকে না। শেষ পর্যন্ত সেই বিষাক্ত ধোঁয়া ও অক্সিজেনের অভাবই কেড়ে নেয় ৯টি তাজা প্রাণ। হোটেলের অগ্নিকাণ্ড থেকে কোন মতে প্রাণে রক্ষা পাওয়ার পরে মহম্মদ আমিরুল, ইজাজ আহমেদদের কথায়, ‘চারতলার ঘরে জানলা খুলে রেখেই ঘুমোচ্ছিলাম। হটাৎ ধোঁয়ায় ঘুম ভাঙে। জানলার কাছে গিয়ে দেখি ধোঁয়ায় ঢেকে গিয়েছে চারপাশ। আগুন লেগেছিল তিনতলায়। চারতলায় ছিল শুধু ধোঁয়া। সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে পাশের ঘরের দরজায় ধাক্কা দিই। তারাও বাকিদের জাগানোর চেষ্টা করে। হোটেলের কাউকে ডাকাডাকি করেও পাইনি। লিফট ছিল, কিন্তু তা বন্ধ হয়ে গিয়েছে। সিঁড়ি দিয়ে নামার পরিকল্পনা করি। গিয়ে দেখি সিঁড়িতেও দাউদাউ করে আগুন জ্বলছিল। এক মুহূর্তে মনে হল, আর ঘরে ফেরা হবে না।
তারপর দমকল ও পুলিশ কর্মীরা এগিয়ে আসেন। ওনারা আমাদের উদ্ধার করেন।’ নিউ মার্কেট থানার এলাকার অন্তর্গত ওই হোটেলে আগুন লাগার ঘটনায় নানা প্রশ্ন উঠেছে। বাড়ির হোটেলের আবাসিক এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের অভিযোগ, যে ভাবে এই হোটেল খুলে ব্যবসা চলছিল, তা সম্পূর্ণ বেআইনি। হোটেল তৈরির সময়ে কোনও নিয়ম মানা হয়নি। বাড়িতে আগুন নেভানোর ব্যবস্থাও ছিল না। নিয়ম হলো, এই ধরনের কমার্শিয়াল বিল্ডিংয়ে জরুরি প্রস্থান গেট থাকা বাধ্যতামূলক। অভিযোগ, ওই বাড়িতে সেই রকম কোনও জরুরি প্রস্থান গেট নেই। প্রবেশ এবং বেরোনোর জন্য একটিই মাত্র গেট। সেটিও সরু।
প্রশ্ন উঠছে, দমকলের দপ্তরে পাশে এ ভাবে হোটেল ব্যবসা চলছিল কী ভাবে? কেন তা এত দিন রাজ্য প্রশাসনের নজরে আসেনি? বহুতলে হোটেল ব্যবসা চালানোর জন্য দমকলের ছাড়পত্র কি আদৌ ছিল হোটেল মালিকদের কাছে? দমকল প্রতিমন্ত্রী কৌশিক চৌধুরী বলেন, ‘কী করে এই হোটেলগুলো পারমিট পেল, ট্রেড লাইসেন্স পেল, সেটা তদন্ত করে দেখা খুবই প্রয়োজন। আমরা সব খতিয়ে দেখে কড়া ব্যবস্থা নেব। দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মুখ্যমন্ত্রী ঘটনার দিকে নজর রেখেছেন।’ বিজেপি নেতা সন্তোষ পাঠকের অভিযোগ, হোটেলগুলি বিধি মেনে তৈরি হয়নি। হোটেলের ঘরের সংখ্যা বাড়াতে পিলার কেটে জায়গা বাড়ানো হয়েছে, যার ফলে ওই হোটেল ভবনটি দুর্বল হয়ে পড়েছিল। সন্তোষের অভিযোগ, ‘এগুলো মূলত আবাসিক ভবন ছিল। সেটাকে বেআইনি ভাবে বাণিজ্যিক করা হয়েছে।’














