আজ, ৪ আগস্ট ২০২৬ তারিখের এই দিনে, আমরা বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের জন্মবার্ষিকী খুব ভালোবাসা, আনন্দ ও শ্রদ্ধার সাথে আবার নতুন করে সবাই মিলে স্মরণ করছি। বাংলা ভাষা এবং আমাদের এই সাধারণ বাংলা সংস্কৃতিকে যারা নিজেদের মন থেকে সত্যি ভালোবাসেন, তাদের সকলের কাছে তাঁর সুন্দর কণ্ঠ অত্যন্ত চেনা, খুব আপন এবং ভীষণ প্রিয়। বহু বছর ধরে প্রতি বছর মহালয়ার ভোরে রেডিওতে তার চণ্ডীপাঠ শুনেই প্রতিটি বাঙালির সবথেকে বড় উৎসব দুর্গাপূজার আসল আনন্দ শুরু হয়ে যায়। তার সেই পরিষ্কার, সুন্দর, মিষ্টি ও সুরের আবৃত্তি প্রতি বছর আমাদের প্রতিটি মানুষের ঘরে ঘরে এক পরম শান্তি, ভক্তি এবং খুশির সুন্দর সময় নিয়ে আসে। কত কত বছর পার হয়ে গেলেও তার গলার সেই চেনা সুর এবং টান আজ একটুও কমে বা বদলে যায়নি। শরতের নরম ভোরের নতুন আলোয় তার সেই চেনা গলার পাঠ প্রতিটি মানুষের মনে নতুন দিনের আলো, ভালোবাসা, আশা এবং পরম উৎসবের সুন্দর আমেজ তৈরি করে দেয়।
তবে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র কেবল মহালয়ার সেই বিশেষ ভোরের চণ্ডীপাঠের মধ্যেই নিজেকে আটকে রাখেননি। এই অসাধারণ এবং অমলিন আবৃত্তির বাইরেও তিনি ছিলেন একজন অত্যন্ত সফল নাট্যকার, বিখ্যাত রেডিও শিল্পী, বেশ দক্ষ অভিনেতা এবং সিনেমার গল্প ও চিত্রনাট্যকার। ১৯৩০-এর দশকের প্রথম দিকে তিনি কলকাতা শহরের আকাশবাণীতে কাজ করতে শুরু করেন এবং টানা প্রায় চার দশক ধরে সেখানে নানা গুরুত্বপূর্ণ কাজের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি খুব সহজ, পরিষ্কার ও সোজা কথা দিয়ে কঠিন কঠিন সব জটিল বাংলা সাহিত্যকে রেডিওর মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কানে ও মনে পৌঁছে দিতেন। শাহজাহান, চন্দ্রগুপ্ত এবং প্রফুল্লর মতো বড় বড় বিখ্যাত সব পুরনো নাটক তিনি রেডিওতে খুব সুন্দরভাবে সবার সামনে ফুটিয়ে তুলেছিলেন। তাঁর নিজের হাতে লেখা প্রিয় মেস নং ৪৯ নাটকটিও সাধারণ মানুষের খুব পছন্দ হয়েছিল, যেখানে মেসের সাধারণ মানুষের জীবনের নানা সরল, মজার ও সত্যি সুন্দর গল্প ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল।
রেডিওর নানা ধরনের কাজের পাশাপাশি তিনি কলকাতার নাটকমঞ্চ এবং আমাদের বাংলা সিনেমার জগতেও সমানভাবে অনেক ভালো ভালো কাজ করেছেন। বিখ্যাত উপন্যাস সাহেব বিবি গোলাম সুন্দর নাটক হিসেবে নাটকমঞ্চে তুলে ধরার কাজ তিনি খুব সাফল্যের সাথে পরিচালনা করেছিলেন। এছাড়া সুবর্ণ গোলক এবং মহিষাসুর বধের মতো বেশ কিছু জনপ্রিয় বাংলা সিনেমার মূল গল্প ও চিত্রনাট্য তিনি নিজে বসে লিখেছিলেন। শহরের যেকোনো বড় খবর বা বিশেষ সামাজিক ঘটনার সময় রেডিওর সামনে দাঁড়িয়ে সুন্দরভাবে তাঁর সরাসরি বিবরণ তুলে ধরার বিশেষ ক্ষমতা তার ছিল। ১৯৪১ সালে যখন আমাদের কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শেষযাত্রা হচ্ছিল, তখন রেডিওতে তাঁর সেই করুণ, নরম ও গভীর আবেগভরা কথা শুনে দেশের অগুনতি সাধারণ মানুষের চোখ জলে ভেসে গিয়েছিল।
এত নাম, কাজের বড় সাফল্য এবং হাজার হাজার সাধারণ মানুষের মন উজাড় করা ভালোবাসা পাওয়া সত্ত্বেও তিনি খুব সাদাসিধে, শান্ত, সরল ও সাধারণ মানুষের মতো জীবন কাটাতে ভালোবাসতেন। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত কোনো অহংকার, নিজের বড় নাম বা দামি খেতাবের প্রতি তাঁর কোনো ইচ্ছা বা লোভ ছিল না। তিনি সবসময় চেয়েছিলেন একদম সহজ ও সুন্দর কাজের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মনের খুব কাছে ভালো সংস্কৃতি পৌঁছে দিতে। আজ তাঁর এই বিশেষ দিনে আমরা তাঁকে কেবল মহালয়ার সেই পরিচিত অমলিন কণ্ঠ হিসেবেই স্মরণ করছি না, বরং একজন খাঁটি, ভালো, সাধারণ ও অত্যন্ত গুণী মহান শিল্পী হিসেবে শ্রদ্ধাভরে মনে রাখছি। তাঁর ফেলে যাওয়া এই সমস্ত কাজ এবং সেই মিষ্টি পরিচিত চেনা স্বর চিরকাল আমাদের সবার অন্তরে এভাবেই প্রতিদিন খুব সুন্দরভাবে বেঁচে থাকবে।















