ইভিএমের পরিবর্তে ব্যালট পেপারে ভোটগ্রহণের দাবি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই সরব কংগ্রেস। সেই ব্যালট পেপারে হওয়া চার রাজ্যের বিধান পরিষদের শিক্ষক ও স্নাতক আসনের নির্বাচনের ফল ঘিরেই এবার নতুন করে রাজনৈতিক তরজা শুরু হয়েছে। উত্তরপ্রদেশ, বিহার, মহারাষ্ট্র ও কর্নাটকের মোট ২৮টি আসনের নির্বাচনে কংগ্রেস কোনও আসনেই জয় পায়নি বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এই ফলকে সামনে রেখে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী কংগ্রেসকে কটাক্ষ করেছেন। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় কংগ্রেসও ব্যালট পেপারে নির্বাচন করানোর দাবিতে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে।
গত ২৩ অক্টোবর চার রাজ্যের শিক্ষক ও স্নাতক কেন্দ্রগুলিতে ভোটগ্রহণ হয়। এই নির্বাচনে সাধারণ লোকসভা বা বিধানসভা নির্বাচনের মতো সমস্ত ভোটার অংশ নেন না। সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রগুলিতে নিবন্ধিত শিক্ষক ও স্নাতকরাই ভোট দেওয়ার সুযোগ পান। ফলে এই নির্বাচনের ফলের রাজনৈতিক গুরুত্ব থাকলেও, একে সরাসরি গোটা দেশের জনমতের প্রতিফলন হিসেবে দেখা যায় না। তবুও ব্যালট পেপারে ভোট হওয়ার পর কংগ্রেসের ফলাফল নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। উত্তরপ্রদেশের ১১টি আসনে বিজেপি ও সমাজবাদী পার্টির মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা যায়। প্রকাশিত ফলের হিসাব অনুযায়ী, বিজেপি ছয়টি এবং সমাজবাদী পার্টি পাঁচটি আসনে জয় পেয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মহারাষ্ট্রের পাঁচটি আসনের মধ্যে ক্ষমতাসীন এনডিএ জোট তিনটি এবং বিরোধী মহা বিকাশ আগাড়ি দুটি আসনে জয় পেয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। বিহারের আটটি আসনের নির্বাচনে এনডিএ চারটি আসনে জয় পেয়েছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। রাষ্ট্রীয় জনতা দল একটি এবং প্রশান্ত কিশোরের জন সুরাজ পার্টি একটি আসনে জয় পেয়েছে। বাকি দুটি আসনে জয়ী হয়েছেন নির্দল প্রার্থীরা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই ফলের মধ্য দিয়ে বিহারে আঞ্চলিক দল ও নির্দল প্রার্থীদের উপস্থিতিও নজরে এসেছে। কর্নাটকের ফল বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। কারণ, এই রাজ্যে ক্ষমতায় রয়েছে কংগ্রেস। তা সত্ত্বেও চারটি শিক্ষক ও স্নাতক আসনের কোনওটিতেই দলটি জয় পায়নি বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। সেখানে বিজেপি তিনটি এবং তাদের জোটসঙ্গী জনতা দল সেকুলার একটি আসনে জয় পেয়েছে বলে জানানো হয়েছে। তবে রাজ্যভিত্তিক আসনসংখ্যা ও চূড়ান্ত ফল প্রকাশের ক্ষেত্রে সরকারি নির্বাচন সংক্রান্ত তথ্য যাচাই করা জরুরি। এই ফলাফলকে কেন্দ্র করে কংগ্রেসের ইভিএম-বিরোধী অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।
সমাজমাধ্যম এক্সে চার রাজ্যের ২৮টি আসনে ব্যালট পেপারে ভোটগ্রহণের প্রসঙ্গ তুলে তিনি কংগ্রেসের জয় নিয়ে কটাক্ষ করেন। তাঁর বক্তব্যের মূল লক্ষ্য ছিল, ইভিএম নিয়ে আপত্তি জানালেও ব্যালট পেপারে ভোট হওয়ার পর কংগ্রেস কেন সাফল্য পেল না, সেই প্রশ্ন সামনে আনা। বিজেপির বক্তব্য, নির্বাচনে পরাজয়ের পর ইভিএম নিয়ে প্রশ্ন তোলার পরিবর্তে রাজনৈতিক দলগুলির উচিত নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি ও নির্বাচনী কৌশল পর্যালোচনা করা। যদিও এই নির্বাচনের ফল দিয়ে ইভিএম নিয়ে অতীতের সমস্ত অভিযোগের নিষ্পত্তি হয়ে যায়, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ঠিক হবে না। নির্বাচনী পদ্ধতি নিয়ে বিতর্কের নিষ্পত্তির জন্য নির্দিষ্ট অভিযোগ, প্রমাণ এবং নির্বাচন কমিশনের তথ্য বিবেচনা করা প্রয়োজন।
প্রধানমন্ত্রীর কটাক্ষের পর পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে কংগ্রেস। দলের পক্ষ থেকে আগামী দিনে লোকসভা ও বিধানসভা নির্বাচন ব্যালট পেপারে করানোর দাবি জানানো হয়েছে। কংগ্রেসের বক্তব্য, নির্বাচনী ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে তাদের প্রশ্নের জবাব রাজনৈতিক কটাক্ষের মাধ্যমে নয়, বরং নিরপেক্ষ প্রক্রিয়া ও বিশ্বাসযোগ্য ব্যবস্থার মাধ্যমে দেওয়া উচিত। এর পাশাপাশি ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়া এবং নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়েও আপত্তি তুলেছে কংগ্রেস। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবি এবং তাঁকে আইনি সুরক্ষা প্রদানকারী আইন বাতিলের দাবিও দলের বক্তব্যে উঠে এসেছে।
ফলে চার রাজ্যের এমএলসি নির্বাচনের ফল শুধু আসনসংখ্যার হিসাবেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, তা আবারও জাতীয় রাজনীতিতে নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্ককে সামনে এনেছে। বিরোধীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কী বার্তা? চার রাজ্যের ফল কংগ্রেসের জন্য রাজনৈতিকভাবে অস্বস্তিকর হলেও, এই নির্বাচন থেকে বিরোধী রাজনীতির ভবিষ্যৎ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো সম্ভব নয়। শিক্ষক ও স্নাতক কেন্দ্রগুলির ভোটারসংখ্যা সীমিত। তাঁদের পেশাগত স্বার্থ, স্থানীয় প্রার্থী, সংগঠনের শক্তি এবং আঞ্চলিক সমীকরণ ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
লোকসভা বা বিধানসভা নির্বাচনে ভোটারদের পরিধি এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পূর্ণ আলাদা। তাই এই ফল কংগ্রেসের সংগঠন ও নির্বাচনী কৌশল নিয়ে প্রশ্ন তুললেও, বিরোধী জোটের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের একমাত্র মাপকাঠি হতে পারে না। একই সঙ্গে বিজেপি ও এনডিএর সাফল্যকে সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী কেন্দ্রগুলির প্রেক্ষাপটেই বিচার করা প্রয়োজন। সব মিলিয়ে, ব্যালট পেপারে ভোটের ফলকে কেন্দ্র করে বিজেপি ও কংগ্রেসের রাজনৈতিক সংঘাত নতুন মাত্রা পেয়েছে। একদিকে বিজেপি কংগ্রেসের পরাজয়কে তাদের ইভিএম-বিরোধী অবস্থানের বিরুদ্ধে যুক্তি হিসেবে তুলে ধরছে, অন্যদিকে কংগ্রেস নির্বাচনী ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে নিজেদের দাবি বজায় রেখেছে। আগামী দিনে এই বিতর্ক কোন দিকে এগোয়, তা নির্ভর করবে রাজনৈতিক দলগুলির পরবর্তী পদক্ষেপ এবং নির্বাচনী ব্যবস্থার বিষয়ে আলোচনার উপর।















