ভারতের মণিপুর সীমান্তে কয়েক দশক ধরে চলা অচিহ্নিত সীমান্ত সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারের সঙ্গে জমি বিনিময়ের এক সম্ভাব্য প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে নয়া দিল্লি। মঙ্গলবার নয়াদিল্লিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রকের (এমইএ) মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছেন যে, সীমান্তে বেশ কিছু চিহ্নিতকরণ অসম্পূর্ণ রাখা এলাকা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা চলছে। মণিপুর সীমান্তে জমি বিনিময়ের বিষয়ে ভারত চিন্তাভাবনা করছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে জয়সওয়াল সরাসরি প্রস্তাবের বিষয়ে বিশদ তথ্য নিশ্চিত না করলেও অচিহ্নিত অংশগুলোর নিষ্পত্তির জন্য যে কথাবার্তা এগোচ্ছে তা স্বীকার করে নিয়ে বলেন, “সীমান্তে এমন কিছু নির্দিষ্ট এলাকা রয়েছে যেগুলোর এখনও নিষ্পত্তি হয়নি। সেই অংশগুলো নিয়ে আলোচনা চলছে।” আমেরিকান সংবাদ সাময়িকী ‘দ্য ডিপ্লোম্যাট’-এ গত ১৭ জুলাই প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের পরেই এই বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। একটি সরকারি নথির বরাতে উক্ত সাময়িকীতে দাবি করা হয়, মণিপুরের চান্দেল জেলায় ভারত-মিয়ানমার সীমান্তের ৬৫ থেকে ৬৮ নম্বর পিলারের মধ্যবর্তী প্রায় ২.৮ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য জুড়ে আনুমানিক ১.৪ বর্গমাইল ভূখণ্ড বিনিময়ের একটি প্রস্তাব সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করছে ভারত সরকার। ওই অংশটি মিয়ানমারের সাগাইং অঞ্চলের কাবাও উপত্যকা সংলগ্ন। ২০২৬ সালের ২৬ মে তারিখের একটি নথির সূত্রে জানানো হয়, আগস্ট মাসের মধ্যেই এই চিহ্নিতকরণ ও জমি হস্তান্তরের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রাখা হয়েছে।
উল্লেখ্য, অরুণাচল প্রদেশ, নাগাল্যান্ড, মণিপুর এবং মিজোরাম জুড়ে ভারতের সাথে মিয়ানমারের মোট ১,৬৪৩ কিলোমিটার দীর্ঘ আন্তর্জাতিক সীমানা রয়েছে, যার মধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী ১,৪৭২ কিলোমিটার সীমানায় পিলার স্থাপন করে চিহ্নিত করা হলেও প্রায় ১৭১ কিলোমিটার অংশ এখনও অচিহ্নিত থেকে গেছে। প্রস্তাবিত জমি বিনিময়ের মূল উদ্দেশ্য হল সীমান্ত সীমানা নির্ধারণের কাজ দ্রুত শেষ করা, যাতে অনুপ্রবেশ, উগ্রপন্থী তৎপরতা ও আন্তঃসীমান্ত অপরাধ ঠেকাতে পুরো সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হয়। ২০২৪ সালে ভারতের পক্ষ থেকে সম্পূর্ণ সীমান্ত ঘেরা এবং ২০১৮ সাল থেকে চালু থাকা ভিসামুক্ত ফ্রি মুভমেন্ট রেজিম বাতিলের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল।
গত মাসে মিয়ানমারের শাসক প্রধান মিন অং হ্লেং-এর ভারত সফরের সময়ও এই বিষয়টি নিয়ে কথা হয়েছে বলে জানা গেছে, যেখানে মোলচাম সেক্টরের ৬৫ থেকে ৬৮ নম্বর পিলারের মাঝে নতুন ও সহায়ক সীমানা পিলার স্থাপন এবং ২০১৭ সালের পররাষ্ট্র মন্ত্রকের একটি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করা হয়। উল্লেখ্য, এর আগে ২০১৫ সালে বাংলাদেশের সঙ্গে ঐতিহাসিক স্থল সীমান্ত চুক্তির মাধ্যমে ১১১টি ছিটমহল হস্তান্তর ও ৫১টি ছিটমহল গ্রহণের মাধ্যমে ৪১ বছরের পুরোনো সীমানা বিরোধ মিটিয়েছিল ভারত।
এদিকে জমি হস্তান্তরের এই সম্ভাব্য প্রস্তাব সামনে আসতেই মণিপুরের স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনগুলোর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। স্থানীয় মৈতেই সামাজিক সংগঠনগুলোর সমন্বয়কারী সংস্থা ‘কোঅর্ডিনেটিং কমিটি অন মণিপুর ইন্টিগ্রিটি’ (কোকোমি) নয়া দিল্লিকে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, রাজ্যের ভূখণ্ডের ছোট অংশও মিয়ানমারের হাতে তুলে দেওয়া মানা হবে না। গত ২৭ জুলাই সংগঠনের পক্ষ থেকে এক সতর্কবার্তায় বলা হয়, “প্রতিবেদনের বিষয়বস্তু যদি সত্যি হয় এবং প্রস্তাবটি যদি বাস্তবায়িত করা হয়, তবে কোকোমি নীরব দর্শক হয়ে বসে থাকবে না।” মণিপুরের ঐতিহাসিক আঞ্চলিক অখণ্ডতাকে সম্পূর্ণ অলঙ্ঘনীয় বলে দাবি করে তারা আরও হুঙ্কার দিয়েছে যে, মণিপুরের সাধারণ মানুষের সম্মতি ছাড়া ভূখণ্ড সংক্রান্ত কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের আগুন নিয়ে খেলা উচিত হবে না।












