একটা মোবাইলের স্ক্রিনে কয়েকটি ক্লিক। তারপরই বাড়ির দরজায় পৌঁছে যাচ্ছে খাবার, জামাকাপড়, ওষুধ থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় নানা সামগ্রী। আজকের দ্রুতগতির জীবনে অনলাইন কেনাকাটা ও হোম ডেলিভারি কার্যত মানুষের দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। কিন্তু এই সুবিধার নেপথ্যে যাঁরা প্রতিদিন রাস্তায় ছুটে বেড়াচ্ছেন, সেই ডেলিভারি কর্মীদের জীবনটা কেমন? তাঁদের রোজগার কতটা স্থায়ী?
ভবিষ্যৎই বা কতটা নিরাপদ? সকাল থেকে রাত। কখনও প্রচণ্ড রোদ, কখনও মুষলধারে বৃষ্টি, কখনও আবার শীতের কনকনে ঠান্ডা—সবকিছুকে উপেক্ষা করেই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অর্ডার পৌঁছে দেওয়ার তাগিদে রাস্তায় ছুটছেন ডেলিভারি কর্মীরা। কারও হাতে মোটরবাইক, কারও ভরসা স্কুটার কিংবা সাইকেল। মোবাইলে একের পর এক অর্ডারের নোটিফিকেশন, আর সেই অর্ডার পূরণ করতেই শুরু হয় ছুটে চলা। তবে বাইরে থেকে যতটা সহজ মনে হয়, বাস্তবে এই পেশার লড়াই ততটাই কঠিন। প্রতিদিনের আয়ের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে জ্বালানির খরচ, গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ, মোবাইল ও ইন্টারনেটের খরচ, দুর্ঘটনার ঝুঁকি এবং দীর্ঘ সময় রাস্তায় থাকার শারীরিক পরিশ্রম।
অনেক ক্ষেত্রেই কাজের পরিমাণের সঙ্গে আয়ের সরাসরি সম্পর্ক থাকায় বেশি অর্ডারের আশায় দীর্ঘ সময় কাজ করতে হয়। একজন ডেলিভারি কর্মীর কথায়, “অর্ডার বেশি থাকলে আয় কিছুটা বাড়ে। কিন্তু অর্ডার কম থাকলে বসে থাকতে হয়। তার মধ্যেই পেট্রল, গাড়ির খরচ, মোবাইলের খরচ রয়েছে। মাসের শেষে হাতে কত টাকা থাকছে, সেটাই বড় প্রশ্ন।” আরও এক কর্মীর কথায়, “ছুটি নিলে আয় বন্ধ। অসুস্থ হয়ে কয়েকদিন কাজ করতে না পারলে সংসারে তার প্রভাব পড়ে। ভবিষ্যতের জন্য কী থাকবে, সেটাই বুঝতে পারি না।” অনলাইন পরিষেবার বাজার যত বাড়ছে, ততই বাড়ছে ডেলিভারি কর্মীদের উপর নির্ভরতা। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, এই বিপুল কর্মসংস্থানের কতটা দীর্ঘমেয়াদি?
প্রযুক্তি ও স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা আগামী দিনে আরও এগিয়ে গেলে এই কর্মীদের কাজের ধরন কী বদলাবে? অ্যাপ নির্ভর কাজের ক্ষেত্রে কর্মীদের সামাজিক সুরক্ষা, স্বাস্থ্যসুরক্ষা, দুর্ঘটনাজনিত ক্ষতিপূরণ কিংবা অবসরকালীন নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত—সেই প্রশ্নও ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। অন্যদিকে, অনেক তরুণের কাছে এই পেশা আপাতত আয়ের একটি দ্রুত সুযোগ তৈরি করেছে। পড়াশোনা শেষ করে স্থায়ী চাকরির অপেক্ষায় থাকা যুবক থেকে শুরু করে সংসারের বাড়তি আয়ের জন্য কাজ করা বহু মানুষ এই পেশার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন। কিন্তু স্থায়ী বেতন, নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা এবং দীর্ঘমেয়াদি চাকরির নিরাপত্তার অভাব তাঁদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। গ্রাহকের কাছে কয়েক মিনিট দেরি মানে হয়তো বিরক্তি।
কিন্তু সেই কয়েক মিনিটের পিছনে থাকতে পারে যানজট পেরিয়ে ছুটে আসা একজন মানুষ, যিনি সময়ের সঙ্গে লড়াই করছেন নিজের সংসার চালানোর জন্য। একটি রেটিং বা একটি অভিযোগ যেখানে ডেলিভারি কর্মীর আয়ের উপর প্রভাব ফেলতে পারে, সেখানে তাঁর শ্রমের মূল্যায়নের প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, অনলাইন পরিষেবার এই দ্রুত সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে গিগ ও ডেলিভারি কর্মীদের সামাজিক ও আর্থিক সুরক্ষার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার। কারণ অনলাইনে অর্ডার করা পণ্যটি হয়তো কয়েক মিনিটেই দরজায় পৌঁছে যায়, কিন্তু সেই সুবিধার পিছনে থাকা মানুষের জীবনে স্বস্তি পৌঁছতে এখনও অনেকটা পথ বাকি। প্রশ্ন তাই একটাই—অনলাইন কেনাকাটার ভবিষ্যৎ যখন আরও উজ্জ্বল, সেই ভবিষ্যতের নেপথ্যে ছুটে চলা ডেলিভারি কর্মীদের ভবিষ্যৎ কতটা নিরাপদ?














