ভারত-আমেরিকা বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে ফের আরেকবার সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে কাঠগড়ায় তুললেন রাহুল গান্ধী। লোকসভার পর সোশ্যাল মিডিয়া সর্বত্রই সুর চড়িয়েছেন বিরোধী দলনেতা। তাঁর অভিযোগ, এই চুক্তির আড়ালে দেশের কৃষকদের সঙ্গে চূড়ান্ত ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ করছে কেন্দ্র। রবিবারের দুপুরে মোদী সরকারের দিকে পাঁচটি ধারালো প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে রাহুল দাবি করছেন, কৃষিপণ্য আমদানির এই সিদ্ধান্তে আদতে কোপ পড়বে দেশের অন্নদাতাদের পেটে। কংগ্রেস সাংসদের অভিযোগ, আমেরিকার চাপে নতিস্বীকার করে দেশ বিক্রির পথে হাঁটছে বিজেপি সরকার। রাহুলের আক্রমণের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে আমেরিকার সঙ্গে হওয়া অন্তর্বর্তী বাণিজ্য চুক্তি। তিনি মনে করছেন, এই চুক্তির ফলে ভারতের কৃষিব্যবস্থা কার্যত মার্কিন সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে। তাঁর প্রথম প্রশ্নটি সরাসরি পশুখাদ্য বা ডিডিজি আমদানি নিয়ে। রাহুল জানতে চেয়েছেন, ‘ডিডিজি আমদানির বাস্তবিক অর্থ কী? এর মানে কি, ভারতের গবাদি পশুদের আমেরিকার জিএম কর্ন (ভুট্টার দানা) থেকে তৈরি ডিসটিলার্স গ্রেন খাওয়ানো হবে?
এর ফলে আমাদের দুগ্ধজাত পণ্যগুলির উৎপাদন আমেরিকার কৃষি ব্যবস্থার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে না তো?’ দুগ্ধ শিল্পের পাশাপাশি ভোজ্য তেলের বাজারেও বড়সড় বিপর্যয়ের মেঘ দেখছেন রাহুল। জিএম সোয়া তেলের আমদানি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে তাঁর দ্বিতীয় প্রশ্ন,‘আমরা যদি জিএম সোয়া তেলের আমদানিতে অনুমতি দিই, তাহলে মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, রাজস্থান এবং সারাদেশের সোয়া কৃষকদের কী হবে? আরেকটা দামের ধাক্কা কী করে সামলাবেন তাঁরা?’ রাহুল মনে করেন, বিদেশের সস্তা তেল ভারতের বাজারে ঢুকলে বিপাকে পড়বেন দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের চাষিরা। চুক্তিপত্রে উল্লিখিত ‘অতিরিক্ত পণ্য’ বা ‘অ্যাডিশনাল প্রোডাক্টস’ শব্দবন্ধটি নিয়েও রহস্য দানা বেঁধেছে রাহুলের মনে। তাঁর তৃতীয় প্রশ্ন, “ আপনারা ‘অ্যাডিশনাল প্রোডাক্টস’ বা অতিরিক্ত পণ্যের কথা বলছেন, এর মধ্যে কী কী রয়েছে? এটি কি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমেরিকা থেকে ডাল এবং অন্যান্য ফসল আমদানির জন্য রাস্তা উন্মুক্ত করার চাপের লক্ষণ? ’’
চতুর্থ প্রশ্নে তিনি আঘাত করেছেন বাণিজ্য নীতির কারিগরি দিকে। রাহুলের প্রশ্ন, “ ‘নন-ট্রেড ব্যারিয়ার্স’ অর্থাৎ অবাণিজিক বাধা হঠানোর মানে কী? জিএম শস্য নিয়ে ভারতকে ভবিষ্যতে তার অবস্থান শিথিল করা, ক্রয় দুর্বল করা বা ন্যূনতম সহায়ক মূল্য (এমএসপি) ও বোনাস কম করার জন্য চাপ দেওয়া হবে? ” কৃষকদের সুরক্ষাকবচ হিসেবে পরিচিত এমএসপি-র ভবিষ্যৎ নিয়ে তাই চরম উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তিনি। সবশেষে একটি সুদূরপ্রসারী আশঙ্কার কথা শুনিয়েছেন রাহুল। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, “ একবার যদি এই দরজাগুলি খুলে যায়, তাহলে প্রতি বছর আরও বেশি করে উন্মুক্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সেটা আমরা কী করে আটকাব? নাকি, প্রতিবার সমঝোতার সময় আলোচনার টেবিলে আরও বেশি শস্য রাখা হবে? ” রাহুলের এই তীক্ষ্ণ আক্রমণে অস্বস্তিতে শাসক শিবির।
তবে এদিকে এই সাঁড়াশি আক্রমণের মুখেই রাহুলের সাংসদ পদ কেড়ে নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে বিজেপি। প্রাক্তন সেনাপ্রধান মনোজ মুকুন্দ নারাভানের অপ্রকাশিত বই থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় বাজেট এবং ভারত-আমেরিকা চুক্তি নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানোর অভিযোগে বিদ্ধ করা হয়েছে তাঁকে। এমনকি কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরীকে ‘এপস্টেইন ফাইল’ ইস্যুতে আক্রমণ করায় বিষয়টি চরমে পৌঁছায়।
এই নিয়ে ইতিমধ্যে বিজেপি সাংসদ নিশিকান্ত দুবে লোকসভায় রাহুলের বিরুদ্ধে স্বাধিকার ভঙ্গের বা ‘সাবস্টানসিভ মোশন’ আনার নোটিস জমা দিয়েছেন। দুবের সরাসরি তোপ, রাহুল গান্ধীকে দেশকে ধ্বংস করার জন্য ঠিক কারা টাকা জোগাচ্ছে? কীভাবে তাঁর হাতে অপ্রকাশিত বইয়ের তথ্য এল? এই সমস্ত অভিযোগে রাহুলের সদস্যপদ খারিজের পাশাপাশি তাঁর আজীবন ভোটে লড়ার অধিকারে নিষেধাজ্ঞারও দাবি তুলেছে বিজেপি। অর্থনীতি থেকে বিদেশনীতি, সব ক্ষেত্রেই সরকারের সম্মানহানির অভিযোগে রাহুলকে কোণঠাসা করার এই রণকৌশল এখন দিল্লির রাজনীতিকে অগ্নিগর্ভ করে তুলেছে।















