মুর্শিদাবাদের রেজিনগরে উপনির্বাচনের উত্তেজনার পারদ যখন তুঙ্গে, ঠিক সেই সময়ই আম জনতা উন্নয়ন পার্টি প্রধান হুমায়ুন কবীরের গ্রেপ্তারির ঘটনায় নতুন মোড় নিল রাজ্য রাজনীতি। ভোটের দিন সকালে পুলিশি বচসা ও উত্তেজনার জেরে হুমায়ুন কবীরকে আটক এবং পরে গ্রেপ্তার করার পর থেকেই শুরু হয়েছে রাজনৈতিক তরজা। এই পুরো ঘটনা প্রসঙ্গে মুখ খুলেছেন রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। নন্দীগ্রামে নিজের ভোটদান সেরে বেরোনোর সময় সাংবাদিকরা হুমায়ুন কবীরের গ্রেপ্তারির বিষয়ে প্রশ্ন করলে শুভেন্দু অত্যন্ত স্পষ্ট ও কড়া ভাষায় বলেন, ‘আমি তো গুরুত্ব দিচ্ছি না। আপনারা কেন দিচ্ছেন? কেন উনি বুথের বাইরে যাচ্ছেন?
আমিও আজ মুখ্যমন্ত্রী হয়ে নিয়ম ভাঙতে পারি না। উনি কেন যাচ্ছেন?’ মঙ্গলবার সকাল থেকেই রেজিনগরে ভোটের শুরু থেকেই তুমুল উত্তেজনা ছড়িয়েছিল। হুমায়ুন কবীরের অভিযোগ ছিল, ভোর থেকেই তাঁর বাড়ি ঘিরে রেখেছিল বিশাল পুলিশ বাহিনী এবং শাসকদলের মদতে এলাকায় অবাধে ভোট লুট চলছে। অন্যদিকে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বারবার সতর্ক করা সত্ত্বেও তিনি নিয়ম ভেঙে বুথ চত্বরে প্রবেশ করেন এবং পুলিশের সঙ্গে তীব্র ধস্তাধস্তিতে জড়িয়ে পড়েন। এই ঘটনার পরেই তাঁকে টেনে-হিঁচড়ে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়।
এই হাই-ভোল্টেজ গ্রেপ্তারির পর রেজিনগরে রাজনৈতিক চাপানউতোর চরমে পৌঁছেছে। নন্দীগ্রাম বিধানসভা উপনির্বাচনের ভোট গ্রহণের দিন অর্থাৎ আজ মঙ্গলবার কনভয় ছেড়ে টোটোয় চেপে বুথে যান শুভেন্দু। আর পাঁচ জন পথচলতি মানুষের সঙ্গে সৌজন্য বিনিময় করতে করতে পৌঁছন ভোট দিতে। ভোট দিয়ে বেরিয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি জানান, উপনির্বাচনে সাধারণত ভোটারদের উপস্থিতি কিছুটা কম হলেও বেলা গড়াতেই ৫০ শতাংশের বেশি ভোট পড়ে গিয়েছে। তাঁর বিশ্বাস, শেষ পর্যন্ত ভোটদানের হার ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ স্পর্শ করবে এবং রেকর্ড মার্জিনে বিজেপি জয়ী হবে। নন্দীগ্রামের সঙ্গে নিজের দীর্ঘদিনের আত্মিক সম্পর্কের কথা মনে করিয়ে দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘২০১৬ সালে এই মাটি থেকেই ৮২ হাজার ভোটের ব্যবধানে জিতেছিলাম।
আমার বিশ্বাস, এ বার সেই রেকর্ডও ভেঙে যাবে। আইনি নিয়ম মেনে একসঙ্গে দু’টি বিধানসভা কেন্দ্রে প্রতিনিধিত্ব করা সম্ভব নয় বলেই ভবানীপুর কেন্দ্রটি রেখেছি। কিন্তু নন্দীগ্রামের মানুষের কাছে আমার দৃঢ় অঙ্গীকার— কালের নিয়মে সবাইকে চলে যেতে হয়, তবে আমৃত্যু আমার নাম এই নন্দনায়কবাড়ের ভোটার তালিকাতেই থাকবে।’ স্থানীয় বাসিন্দাদের আশ্বস্ত করে তিনি জানান, মুখ্যমন্ত্রী হলেও তাঁর আচার-আচরণ, পোশাক-পরিচ্ছদ বা জীবনযাত্রায় সামান্যতম পরিবর্তন আসেনি। পূর্ববর্তী বছরগুলির মতোই আসন্ন জগদ্ধাত্রী পুজোতেও তিনি নন্দীগ্রামেই আসবেন। নির্বাচন কমিশনের বিধিনিষেধ পালনের বিষয়ে কড়া বার্তা দিয়ে শুভেন্দু জানান, ভোটের দিন রাজ্য প্রশাসনের নয়, শেষ কথা বলবে কেবল নির্বাচন কমিশনের আইন। তিনি বলেন, ‘আজকের দিনে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে আমি বাড়তি কোনও সুবিধা নিইনি। নিয়ম অনুযায়ী ভোট দিয়ে নিজের বুথ এলাকার অস্থায়ী অফিসেই সময় কাটাচ্ছি। বুথের বাইরে গিয়ে প্রচার করার অনুমতি কমিশনের বিধিতে নেই।
‘ রেজিনগরে বিধিভঙ্গের অভিযোগে নওদার বিধায়কের বিরুদ্ধে পুলিশি পদক্ষেপের প্রসঙ্গ টেনে তাঁর বক্তব্য, ‘আইন সকলের জন্য সমান। আমি মুখ্যমন্ত্রী হলেও অন্য বুথে গিয়ে নিয়ম ভাঙলে পুলিশ আমাকেও আটক করতে পারে। হুমায়ুনজি যা করেছেন, তা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।’ নন্দীগ্রামে বিরোধী শিবিরের বুথ ক্যাম্প ও পোলিং এজেন্টের অনুপস্থিতি নিয়ে কটাক্ষ করে মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেন, বিরোধীদের সঙ্গে নন্দীগ্রামের সাধারণ মানুষের আর কোনও সম্পর্ক নেই। পাঁচ মাসের নতুন সরকারের কাজের ওপর ভরসা রেখেই মানুষ ভোট দিচ্ছেন। আগামী দিনে যুব সমাজের কর্মসংস্থান, গ্রামীণ পরিকাঠামোর সার্বিক উন্নয়ন, বিদ্যালয়ের মানোন্নয়ন এবং প্রবীণ নাগরিকদের স্বাচ্ছন্দ্য সুনিশ্চিত করতে তাঁর সরকার আরও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করবে বলে প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।















