দীর্ঘ ১৫ বছর আগেকার সেই বহুল চর্চিত স্লোগান বদলে গেল এক ঝটকায়। ২০১১-র বিধানসভা নির্বাচনের আগে তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মুখে শোনা গিয়েছিল, ‘বদলা নয়, বদল চাই’। কিন্তু ২০২৬-এর নির্বাচনী আবহে মুর্শিদাবাদের মাটি থেকে একেবারে উল্টো সুর শোনা গেল তাঁর গলায়। শমসেরগঞ্জ ও জিয়াগঞ্জের জোড়া সভা থেকে মমতা স্পষ্ট বার্তা দিলেন, ‘এ বার বদলা হবে।’
তবে সেই বদলা গণতান্ত্রিক পথে, ইভিএম-এর মাধ্যমে। আসন্ন নির্বাচনকে ‘দুরন্ত খেলা’ হিসেবে অভিহিত করে দলীয় কর্মীদের ভোটবাক্স ‘মায়ের মতো’ আগলানোর নির্দেশ দিয়েছেন তৃণমূলনেত্রী। বিজেপি ও নির্বাচন কমিশনকে একযোগে আক্রমণ শানিয়ে তিনি অভিযোগ করেন, ইভিএম বিকল করার নাম করে ‘চিপ’ ঢুকিয়ে কারচুপি করতে পারে গেরুয়া শিবির। তাই ভোট শেষ না হওয়া পর্যন্ত এবং গণনার আগে পর্যন্ত সতর্ক নজরদারির হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মমতা। মুর্শিদাবাদের নির্বাচনী জনসভায় দাঁড়িয়ে মমতার আক্রমণের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধন বা এসআইআর।
তাঁর অভিযোগ, পরিকল্পিতভাবে বহু মানুষের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। এমনকি নিজের বিধানসভা কেন্দ্রের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ‘শুধু মুর্শিদাবাদের মানুষের ভোটাধিকারই কাটছে না। আমার নিজের কেন্দ্রেও, যেখানে আমি নিজে প্রার্থী, সেখানেও ৪০ হাজার মানুষের নাম বাদ দিয়েছে।’ এই বঞ্চনার জবাব দিতেই মমতা স্লোগান তুলেছেন, ‘অনেকের নাম বাদ দিয়েছে। অনেক মানুষ মারা গিয়েছেন। এ বার বদলা নেওয়ার পালা। তাই এই খেলার নাম ‘দুরন্ত খেলা’।’ তাঁর দাবি, হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে মানুষের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। এই পরিস্থিতির জন্য সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের পদত্যাগ দাবি করেছেন তিনি। মমতার যুক্তি, যাঁদের আজ অনুপ্রবেশকারী বলে নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে, তাঁদের ভোটেই লোকসভায় জিতেছে বিজেপি।
তাই সেই জয়ও প্রশ্নাতীত নয়। ইভিএম নিয়ে আশঙ্কার কথা জানিয়ে মমতা বলেন, ‘ইভিএম খারাপ করে দিলে অপেক্ষা করতে হবে। কিন্তু তাতে আর ভোট করতে দেবেন না। সারানোর নাম করে ‘চিপ’ ঢুকিয়ে দেবে। ওরা পারে না এমন কোনও কাজ নেই। ভোটের পর ভোটবাক্সকে মায়ের মতো পাহারা দেবেন।’ কর্মীদের উদ্দেশে তাঁর কড়া নির্দেশ, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বুথ ছেড়ে বেরনো চলবে না। বিজেপিকে ‘ভয়ঙ্কর অত্যাচারী’ ও ‘কৌরবের দল’ হিসেবে চিহ্নিত করে তিনি নিজেদের ‘পাণ্ডবের দল’ বলে দাবি করেন। মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, ‘বাঘ-সিংহকে বিশ্বাস করতে পারেন। বিজেপিকে বিশ্বাস করবেন না।’ সাধারণ মানুষকে সতর্ক করে তিনি জানান, তাঁর নাম করে কেউ অ্যাকাউন্ট নম্বর চাইলে যেন দেওয়া না হয়, কারণ বিজেপি ছদ্মবেশে মানুষের সম্পদ কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে।
দলের অন্দরের বিদ্রোহ এবং বিক্ষুব্ধ নেতাদের নিয়েও কড়া মনোভাব দেখিয়েছেন মমতা। বিশেষ করে ফরাক্কার বিদায়ী বিধায়ক মনিরুল ইসলামের প্রসঙ্গ তুলে তিনি রীতিমতো হুঁশিয়ারি দেন। টিকিট না পেয়ে মনিরুল কংগ্রেসের হয়ে মনোনয়ন জমা দেওয়ায় ক্ষুব্ধ নেত্রী বলেন, ‘ফরাক্কার বিধায়ককে বলছি, শুনেছি, তিনি মনোনয়ন জমা দিয়েছেন। আমি তাঁকে বলছি, প্রত্যাহার করে নিতে। না করলে আমি জঙ্গিপুর সাংগঠনিক জেলা তৃণমূল কংগ্রেসের সভাপতি ও সাংসদ খলিলুর রহমানকে বলছি, দল থেকে তাঁকে বহিষ্কার করতে।’ মমতা স্পষ্ট করে দেন, মানুষের জন্য কাজ করলে তবেই দল টিকিট দেয়। তবে কিছু ক্ষেত্রে বয়সের কারণে প্রার্থী বদল হতে পারে বলে তিনি ইঙ্গিত দেন।
যদিও মনিরুল জানিয়েছেন, তিনি কারও হুমকির কাছে মাথানত করবেন না এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতা চালিয়ে যাবেন। গত সপ্তাহে ভবানীপুরে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের রোড শো ঘিরে যে উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, তা নিয়েও সরব হন মমতা। শুভেন্দু অধিকারীর মনোনয়ন যাত্রায় তাঁর বাড়ির সামনে হামলা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। মমতা বলেন, ‘ভবানীপুরে আমার বাড়ির সামনে হামলা হয়। এমনকি, আমার পোস্টারে থুতু দেওয়া হয়েছিল। জুতো দেখানো হয় অভিষেকের বাড়ির দিকে। স্থানীয় লোকজনই এর প্রতিবাদ করেছেন। এর পিছনে কোনও রাজনীতি নেই।’ তাঁর দাবি, বাইরে থেকে ভাড়াটে লোক এনে এই বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় বাহিনীকে আক্রমণ করে তিনি বলেন, ‘ভবানীপুরে কাল কেন্দ্রীয় বাহিনী অসভ্যতা করেছে। আপত্তিকর ভাবে ‘চেক’ করা হয়েছে এক মহিলাকে।’
পরিযায়ী শ্রমিক ইস্যুতে বিরোধীদের পাল্টা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে মমতা দাবি করেন, বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলো থেকেই উল্টে দেড় কোটি মানুষ বাংলায় কাজ করতে এসেছেন। অথচ এখান থেকে বাইরে গেলে বাঙালিদের অপমানিত হতে হয়। দিল্লি থেকে আসা নেতাদের ‘বসন্তের কোকিল’ বলে বিদ্রুপ করেন তিনি। নিজেকে ‘গণতন্ত্রের যোদ্ধা’ হিসেবে তুলে ধরে তিনি মা-বোনেদের তাঁর লড়াইয়ের প্রধান সহযোদ্ধা বলে সম্বোধন করেন। সব মিলিয়ে, নির্বাচনের প্রাক্কালে আক্রমণাত্মক মেজাজে মমতা বুঝিয়ে দিলেন, এবার তাঁর লড়াই স্রেফ জয়ের জন্য নয়, বরং ‘গণতান্ত্রিক বদলা’ নেওয়ার জন্য। আর সেই লড়াইয়ের চাবিকাঠি হিসেবে ইভিএম পাহারায় বিন্দুমাত্র খামতি রাখতে চাইছেন না তিনি।














