পরনে কারও ট্রাউজার্স-টি-শার্ট, কারও আবার শাড়ির শক্ত করে গোঁজা আঁচল। কারো কোলে এক বছরের সন্তান, কারও হাত ধরে আছেন স্বামী, আবার কেউ একাই এসে দাঁড়িয়েছেন ট্র্যাকে। রামগড়ের সিধু কানু স্টেডিয়ামে আসন্ন হোমগার্ড নিয়োগের শারীরিক সক্ষমতা পরীক্ষার প্রস্তুতিমূলক ট্রায়াল রানে এভাবেই ভিড় জমিয়েছিলেন প্রায় ৬ হাজার নারী। সীমিত পদ, দারিদ্র্য, পারিবারিক টানাপোড়েন আর সমাজের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে আত্মমর্যাদা ও আর্থিক স্বাবলম্বিতা অর্জনের লক্ষ্যে হাজারো নারীর লড়াইয়ের এক জীবন্ত ছবি ফুটে উঠল এই মাঠে। ঝাড়খণ্ড হোমগার্ড বাহিনীর রামগড় জেলায় মাত্র ২৮৪টি শূন্যপদের জন্য লড়াইয়ে নেমেছেন প্রায় ২০ হাজার পুরুষ ও নারী প্রার্থী। সম্প্রতি ঘূর্ণিঝড় অর্ণবের কারণে মূল পরীক্ষা কিছুটা পিছিয়ে গেলেও প্রস্তুতিতে কোনো খামতি রাখছেন না প্রার্থীরা।
ভোর পাঁচটা থেকেই স্টেডিয়াম চত্বরে শুরু হয় প্রবাসীদের ভিড়। পুলিশকে ট্রাফিক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সহায়তাকারী এই সহায়ক বাহিনীর চাকরিতে দৈনিক ভাতায় মাসে প্রায় ৩২ হাজার টাকা পর্যন্ত আয়ের সুযোগ থাকে। পাশাপাশি রয়েছে খাকি উর্দি পরার স্বপ্ন এবং নারীদের জন্য মাতৃত্বকালীন ছুটি সহ অতিরিক্ত সুযোগ-সুবিধা।
এই ট্রায়াল রানের ট্র্যাকে প্রতিফলিত হয়েছে একের পর এক জীবনসংগ্রামের গল্প: মীনা কুমারী: হাজারিবাগের ছোটকি টোংরির বাসিন্দা ২৪ বছর বয়সী মীনা একসময় রাজ্য স্তরের কাবাডি খেলোয়াড় ছিলেন। বিয়ের পর দুই সন্তানের মা হলেও নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জেদ ছাড়েননি। স্বামী হীরালালের পূর্ণ সমর্থনে প্রতিদিন ভোর চারটেয় উঠে অনুশীলন করে তিনি আট মিনিটেরও কম সময়ে ১,৬০০ মিটার দৌড় শেষ করে ‘উৎকর্ষ’ বিভাগে নাম লিখিয়েছেন।
যশোদা দেবী: মাণ্ডু ব্লকের ২৬ বছর বয়সী যশোদা প্রায় এক বছর আগে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তানের জন্ম দেন। পেটের পুরনো ব্যথা কমাতে পেটে সাপোর্ট বেল্ট বেঁধেই নেমে পড়েন ট্র্যাকে। গ্রামের রক্ষণশীল পরিবেশের কারণে গ্রাম ছেড়ে মাঠে এসেই পোশাক বদলাতে হয় তাঁকে। ট্র্যাকে একবার আছাড় খেয়ে পড়লেও ফের উঠে দাঁড়িয়ে সাত মিনিটে দৌড় শেষ করেন তিনি। পুনীতা দেবী: রামগড়ের পত্রাতু ব্লকের বাসিন্দা ৩২ বছর বয়সী বিধবা পুনীতা। স্বামী মারা যাওয়ার পর শ্বশুরবাড়ির নির্যাতন এবং কুসংস্কারমূলক অপবাদের শিকার হতে হয় তাঁকে। তিন সন্তানের মুখে অন্ন জোগাতে রাঁচিতে গিয়ে দৈনিক সাড়ে তিনশো টাকার রাজমিস্ত্রির জোগাড়ের কাজ করতেন।
নিজের ও সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়তে শাড়ি পরেই বন্ধু থেকে ধার করা জুতো পায়ে ট্র্যাকে নেমেছেন তিনি। প্রিয়াঙ্কা দেবী: পণের দাবিতে অত্যাচারিত হয়ে চার বছর আগে শ্বশুরবাড়ি থেকে বিতাড়িত হন ২৫ বছর বয়সী প্রিয়াঙ্কা। নিজের সাত বছরের সন্তানকে কাছে ফিরে পাওয়ার আইনি লড়াই চালানোর খরচ এবং নিজের সম্মান ফেরাতে প্রতিদিন প্রায় ১৭ কিলোমিটার দূর থেকে এসে বিনা পারিশ্রমিকে কোচের কাছে দৌড় শিখছেন তিনি।
প্রতিকূল পরিস্থিতি ও সমাজের অনুশাসনকে পেছনে ফেলে আত্মনির্ভর হওয়ার অদম্য বাসনাই এখন এই নারীদের একমাত্র ভরসা। আগামী দিনে মূল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে নিজেদের পরিবারের ভাগ্য বদলানোর লক্ষ্যে ঘাম ঝরাচ্ছেন তাঁরা।















