ভরা বর্ষার মরশুমেও প্রতিকূল আবহাওয়া এবং অনিয়মিত বাতাসের গতিপ্রকৃতির কারণে বঙ্গোপসাগরে দেখা মিলছে না পর্যাপ্ত ইলিশের। এর জেরে একদিকে যেমন চরম আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ে গভীর সমুদ্রে পাড়ি দেওয়া বন্ধ রেখেছেন মৎস্যজীবীরা, তেমনই সরবরাহ তলানিতে গিয়ে পৌঁছানোয় কলকাতার বাজারে মহার্ঘ্য হয়ে উঠেছে বাঙালির প্রিয় এই রুপোলি শস্য। গত ১৪ এপ্রিল থেকে দু’মাসের বার্ষিক সরকারি নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার পর ১৫ জুন থেকে চলতি মরশুমের ইলিশ ধরা শুরু হয়। কিন্তু মৎস্যজীবীদের অভিযোগ, প্রতিকূল আবহাওয়া ও দিকবদলকারী হাওয়ার কারণে সমুদ্রে ঠিকমতো জাল ফেলাই সম্ভব হচ্ছে না।
দক্ষিণ ২৪ পরগনার কাকদ্বীপের ট্রলার মালিক অনিবাশ দাস জানান, ১৫ জুন থেকে আগস্টের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত তাঁর তিনটি ট্রলার মোট পাঁচবার গভীর সমুদ্রে পাড়ি দিয়েছিল। কিন্তু প্রতি ট্রিপেই গড়ে প্রায় ৫০,০০০ টাকা করে লোকসান হয়েছে। অনিবাশবাবু বলেন, “এক একটি ট্রিপে আমাদের প্রায় দেড় লক্ষ টাকা খরচ হয়। অথচ ফিরে আসার পর দেখা যাচ্ছে মাছ বিক্রি করে উঠছে মাত্র ৯০ হাজার থেকে ১ লক্ষ টাকা। এইভাবে বারবার লোকসান টেনে ব্যবসা চালানো সম্ভব নয়, তাই আপাতত সমুদ্রে যাওয়া বন্ধ রেখেছি। ঝোড়ো হাওয়া বা সাইক্লোনের সতর্কতা থাকলে আমরা সমুদ্রে যাই না, তাতে অন্তত ডিজেল বা বরফের খরচটা বাঁচে। কিন্তু এবার খরচ করার পরও লাভের মুখ দেখা যাচ্ছে না।” মৎস্য দফতরের (সামুদ্রিক) সহকারী অধিকর্তা সুরজিৎ বাগ স্বীকার করেছেন যে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণেই এবার ইলিশের জোগান এতটা কম।
তিনি জানান, “সমুদ্রে উত্তাল পরিস্থিতি ও বিরূপ আবহাওয়ার কারণে এবার ইলিশের ফলন ভালো নয়। সামগ্রিক পরিসংখ্যান এখনও চূড়ান্ত হয়নি, তবে বিগত কয়েক বছরের তুলনায় এই মরশুমে ইলিশের জোগান যে সর্বনিম্ন, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।” সাধারণত প্রতি বছর দক্ষিণ ২৪ পরগনা ও পূর্ব মেদিনীপুরের উপকূলবর্তী এলাকা থেকে প্রায় ৪,০০০ থেকে ৬,০০০ টন ইলিশ ওঠে। কিন্তু চলতি বছর ঘাটতির কারণে কলকাতার বাজারে ৮০০ গ্রাম থেকে ১ কেজির সামান্য বেশি ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে কেজি প্রতি ১,৪০০ থেকে ২,০০০ টাকায়, যা অন্যান্য বছরের স্বাভাবিক বাজারদর (৯০০ থেকে ১,৪০০ টাকা)-র তুলনায় অনেকটাই বেশি।
মৎস্যজীবীরা মূলত দু’টি পদ্ধতিতে ইলিশ শিকার করেন— ট্রলিং এবং গিল-নেট
। গিল-নেটের ক্ষেত্রে প্রতিটি ট্রিপে খরচ হয় প্রায় ১.৫ লক্ষ টাকা এবং ট্রলিংয়ের ক্ষেত্রে খরচ দাঁড়ায় ৩.৫ থেকে ৪ লক্ষ টাকার কাছাকাছি। সুন্দরবন সামুদ্রিক মৎস্যজীবী শ্রমিক ইউনিয়নের সম্পাদক সতীনাথ পাত্র জানান, “খরচের সিংহভাগই যায় ডিজেলের পেছনে। গিল-নেটের ক্ষেত্রে কেবল জ্বালানি বাবদই খরচ হয় ১ থেকে ১.৫ লক্ষ টাকা। পর পর দু-তিনবার বিপুল লোকসান হওয়ার পর মৎস্যজীবীদের আর ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষমতা থাকে না।” তবে জুলাইয়ের শেষ থেকে সমুদ্রে যাওয়া বন্ধ রাখার পর, আবহাওয়ায় কিছুটা উন্নতির আশায় বুধবার থেকে ফের বেশ কিছু ট্রলার সমুদ্রে নামতে শুরু করেছে। আবহাওয়া যদি নতুন করে খারাপ না হয়, তবে আগামী এক-দু’সপ্তাহের মধ্যে বাজারে ইলিশের জোগান কিছুটা স্বাভাবিক হতে পারে বলে আশাবাদী মৎস্যজীবী মহল।














