বাঙালির গ্রীষ্মকাল মানেই আমের গন্ধ, আর আমের প্রসঙ্গ উঠলেই অবধারিতভাবে সামনে আসে মালদার নাম। তবে এবার শুধু বাংলার অন্দরমহল বা দেশের সীমানায় নয়, মালদার আমের সুবাস ছড়িয়ে পড়ছে সুদূর ইউরোপ এবং পশ্চিম এশিয়ার বাজারে। মালদা জেলা প্রশাসনের নেওয়া ‘আমার মালদা’ নামক এক বিশেষ উদ্যোগের হাত ধরে মরশুমের প্রথম দফাতেই প্রায় ছয় মেট্রিক টন উন্নত মানের আম রফতানি করা হলো আন্তর্জাতিক বাজারে। বিজ্ঞানের মোড়কে সঠিক বিপণন আর রাজকীয় ব্র্যান্ডিং— এই দুইয়ের যুগলবন্দিতেই যে মালদার আম এবার বিশ্বজয় করতে চলেছে, তা বলাই বাহুল্য।
ইতালির মিলান থেকে দুবাইয়ের বাজার
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, প্রথম চালানের মধ্যেই রয়েছে ইউরোপ ও এশিয়ায় রফতানিযোগ্য প্রিমিয়াম বা প্রথম সারির বেশ কিছু আমের প্রজাতি। এর মধ্যে ‘উত্তম কৃষি পদ্ধতি’ মেনে চাষ করা বিশেষ ক্লাস্টারের লক্ষণভোগ আম পাঠানো হয়েছে ইতালির মিলান শহরে এবং মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশে। এর পাশাপাশি আরও প্রায় দেড় হাজার কিলোগ্রাম উন্নত মানের আম্রপালি আম রফতানি করা হয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরশাহীতে। সব মিলিয়ে প্রথম পর্যায়েই প্রায় ছয় মেট্রিক টন আম বিদেশের মাটিতে পাড়ি জমিয়েছে। এর আগে স্কটল্যান্ড, ব্রিটেন, সংযুক্ত আরব আমিরশাহী এবং ভুটানের মতো দেশেও মালদার আম নিয়মিত রফতানি করা হতো। রাজ্য উদ্যানপালন দফতরের মালদা জেলার ডেপুটি ডিরেক্টর সামন্ত লায়েক অত্যন্ত আশাপ্রদ তথ্য দিয়ে জানিয়েছেন, ‘গত বছর আন্তর্জাতিক রফতানিকারকদের সহায়তায় জেলা থেকে প্রায় ১৫ মেট্রিক টন আম বিদেশে পাঠানো হয়েছিল। সেখানকার ক্রেতাদের কাছ থেকে যে প্রতিক্রিয়া আমরা পেয়েছি, তা এক কথায় চমৎকার। সেই সাফল্যের ওপর ভিত্তি করেই চলতি বছরে ইউরোপ এবং এশিয়ার বিভিন্ন দেশে প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ মেট্রিক টন আম রফতানি করার লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে’।
রসায়নের খাঁচামুক্ত নিখাদ স্বদেশী স্বাদ
বিশ্ব বাজারে মালদার আমের এই আকাশছোঁয়া চাহিদার পেছনে রয়েছে এক বৈজ্ঞানিক রূপান্তর। জেলা প্রশাসনের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ‘ভারতীয় কৃষি গবেষণা পরিষদ’, ‘কেন্দ্রীয় উপক্রান্তীয় উদ্যানপালন প্রতিষ্ঠান’, ‘কৃষি বিজ্ঞান কেন্দ্র’ এবং রাজ্য উদ্যানপালন দফতর যৌথভাবে এই ‘আমার মালদা’ প্রকল্পটির রূপরেখা তৈরি করেছে। এই মাসের শুরুর দিকেই আমের বিশ্বজনীন প্রচার এবং জেলায় পর্যটন টানতে একটি বিশেষ লোগো ও ডেডিকেটেড ওয়েব পোর্টাল চালু করা হয়েছে। এই প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত এক আধিকারিক জানান, আমচাষিদের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল। ফলস্বরূপ, এই আমগুলি উৎপাদনে কোনও অজৈব সার, ক্ষতিকারক কীটনাশক বা নিষিদ্ধ রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়নি। সম্পূর্ণ রাসায়নিকমুক্ত এবং প্রাকৃতিক উপায়ে উৎপাদিত হওয়ার কারণেই আন্তর্জাতিক বাজার থেকে একের পর এক বড় অর্ডার আসছে।
সমন্বয় ও মেধার মেলবন্ধন
মালদার জেলাশাসক রাজনবীর সিং কাপুর এই অভাবনীয় সাফল্যকে প্রশাসনিক সমন্বয় এবং কৃষক-কেন্দ্রিক নীতির এক বড় জয় হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, ‘প্রশাসনিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্তরের মেলবন্ধন মাঠের স্তরে কতটা বড় পরিবর্তন আনতে পারে, এটি তারই প্রমাণ। আমাদের লক্ষ্য হলো কৃষকদের আন্তর্জাতিক বাজারের সুযোগ তৈরি করে দেওয়া, যাতে তাঁদের উপার্জনের পথ আরও প্রশস্ত হয়’। ‘কেন্দ্রীয় উপক্রান্তীয় উদ্যানপালন প্রতিষ্ঠান’-এর প্রধান বিজ্ঞানী দীপক নায়েক এবং ‘মালদা মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশন’-এর সভাপতি উজ্জ্বল সাহা যৌথভাবে এই রূপান্তরের প্রশংসা করেছেন। তাঁদের মতে, মালদার চাষিরা অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক কৃষি পদ্ধতিকে আপন করে নিয়েছেন এবং গুণমানের সঙ্গে কোনও আপস না করেই এই অসাধ্য সাধন করেছেন। সব মিলিয়ে, মালদার লের সংজ্ঞাই যেন বদলে দিয়েছে এই ‘আমার মালদা’ উদ্যোগ। আম রফতানির এই জোয়ার শুধু যে জেলার গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করবে তা নয়, আন্তর্জাতিক রসনাবিদদের পাতেও মালদার আমের কৌলীন্যকে চিরস্থায়ী করে তুলবে।












