ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে রাজ্য সরকারের তোলা সমস্ত আপত্তি ঝেড়ে ফেলল সুপ্রিম কোর্ট। শুক্রবার প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ সাফ জানিয়ে দিয়েছে, বিচারকদের কাজে হস্তক্ষেপ করার জন্য ছোটখাটো অজুহাত দেখানো বন্ধ করতে হবে। এমনকি রাজ্যের মুখ্যসচিব নন্দিনী চক্রবর্তীর ভোটাধিকার নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় যে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, তা-ও এদিন আদালতে পেশ করেন রাজ্যের আইনজীবী কপিল সিব্বল। কিন্তু শীর্ষ আদালত স্পষ্ট করে দিয়েছে, পুরো প্রক্রিয়ার ইতি টানতে হবে এবং বিচারকদের স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে।
রাজ্য বনাম নির্বাচন কমিশনের এই আইনি লড়াই এখন চরম পর্যায়ে। শুক্রবার শুনানির শুরুতে রাজ্যের পক্ষে সওয়াল করেন প্রবীণ আইনজীবী কপিল সিব্বল। তাঁর মূল অভিযোগ ছিল, এসআইআর প্রক্রিয়ায় নিযুক্ত বিচারকদের প্রশিক্ষণের নামে নির্বাচন কমিশন আসলে তাঁদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে। সিব্বল আদালতে বলেন, ‘ কিছু অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছে। যদিও আপনারা আদেশ দিয়েছেন, সমস্ত পদ্ধতি কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি এবং কমিটি দ্বারা নিষ্পত্তি করা হবে। কিন্তু সবটাই হচ্ছে পিছন থেকে। আধিকারিকদের জন্য নির্দেশিকা জারি করা হয়েছে এবং ট্রেনিং মডিউল জারি করা হয়েছে। যেখানে বলা হয়েছে কোনটা তাঁদের গ্রহণ করা উচিত, আর কোনটা উচিত নয়। ’
সিব্বলের এই যুক্তিতে অবশ্য বিন্দুমাত্র আমল দেয়নি প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত কার্যত ভর্ৎসনার সুরে বলেন, ‘পুরো প্রক্রিয়া আটকে দেওয়ার জন্য ছোটখাটো অজুহাত দেখাবেন না। বিষয়টির ইতি টানতে হবে। বিচারকদের কাজ করতে দিন। তাঁরা স্বাধীনভাবে কাজ করবেন।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘আদালত স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, কোন নথিগুলি খতিয়ে দেখা উচিত বা খতিয়ে দেখতে হবে। আমরা এভাবে কোনও কথা শুনব না। এই বিতর্কের অবসান ঘটাতেই হবে। আমরা আমাদের বিচার বিভাগের আধিকারিকদের ভালো করে জানি। তাঁদের কোনও কিছুর দ্বারা প্রভাবিত করা যাবে না।’
শুনানি চলাকালীন বেঞ্চের অন্য সদস্য বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী পাল্টা প্রশ্ন তোলেন রাজ্যের ভূমিকার উপর। তিনি বলেন, ‘আপনার কথা মেনে নিলে এই প্রক্রিয়াটি বোঝানোর জন্য বিচারকদের প্রশিক্ষণ দেবে কে? আমাদের নির্দেশ দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। কমিশন কোনও নির্দেশকেই অগ্রাহ্য করতে পারে না।’ সিব্বল পাল্টা অভিযোগ করেন যে, মহকুমাশাসকের দেওয়া ডোমিসাইল সার্টিফিকেট গ্রহণ করা হবে না বলে কমিশন মৌখিক নির্দেশ দিচ্ছে। বিচারপতি বাগচী সেই অভিযোগও খারিজ করে দিয়ে বলেন, কমিশনের এসআইআরের বিজ্ঞপ্তি এবং আমাদের নির্দেশে কী রয়েছে সেটি দেখুন। সেখানে এই শংসাপত্র নিয়ে কী বলা হয়েছে। যদি নির্দেশ থাকে কমিশনকে অবশ্যই তার বিবেচনা করতে হবে।
এদিনের শুনানিতে সবথেকে চমকপ্রদ তথ্য ছিল রাজ্যের মুখ্যসচিব নন্দিনী চক্রবর্তীকে নিয়ে। সিব্বল অভিযোগ করেন, স্বয়ং মুখ্যসচিবের নাগরিকত্ব বা ভোটাধিকার নিয়েই প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। কলকাতার রাসবিহারী এলাকার ভোটার মুখ্যসচিবের বাড়িতে গত ডিসেম্বরে বিএলও এবং ইআরও-রা গিয়েছিলেন তাঁর এনুমারেশন ফর্মে থাকা ত্রুটি সংশোধনের জন্য। সিব্বল এদিন ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, ‘রাজ্যের মুখ্যসচিবের নোটিস বিচারাধীন। তাঁকেও নিজের পরিচয়পত্র বা যোগ্যতার প্রমাণ দিতে বলা হয়েছে।’ তৃণমূল সাংসদ তথা আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ও একই সুরে প্রশ্ন তোলেন, ‘মুখ্যসচিবের বিষয়ও বিচারাধীন!’ প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ১৯৯৩ ব্যাচের এই আইএএস আধিকারিক রাজ্যের দ্বিতীয় মহিলা মুখ্যসচিব। তাঁর মতো পদমর্যাদার ব্যক্তির ভোটাধিকার নিয়ে টানাপোড়েন চলায় রাজ্য যে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন, তা এদিন স্পষ্ট করে দেওয়া হয়। অন্যদিকে, ‘গোপনে নির্দেশ’ দেওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক (সিইও) মনোজ আগরওয়াল নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। তিনি বলেন, ‘কখন এমন নির্দেশ দিয়েছি সেটা আমাকে জানাতে হবে। আমার কাছে কেউ কোনও অভিযোগ জানায়নি।’
সুপ্রিম কোর্ট গত ২৪ ফেব্রুয়ারি নির্দেশ দিয়েছিল যে, ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে কমিশনকে এসআইআর তালিকা প্রকাশ করতে হবে। কাজের গতি বাড়াতে পশ্চিমবঙ্গ ছাড়াও ঝাড়খণ্ড এবং ওড়িশার বিচার বিভাগীয় আধিকারিকদের নিয়োগের অনুমতি দিয়েছিল আদালত। শুক্রবারের রায়ে শীর্ষ আদালত পুনরায় জানিয়ে দিল, নির্বাচন কমিশন বা রাজ্য সরকার,কেউই আদালতের নির্ধারিত লক্ষ্মণরেখার বাইরে যেতে পারবে না। আদালত নিজের বিচারকদের উপর পূর্ণ আস্থা রেখে এই বিতর্কিত অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটাতে চাইছে।











