ফুটবল মাঠে আবেগের বিস্ফোরণ ঘটা স্বাভাবিক, কিন্তু সেই আবেগের আড়ালে যদি উঁকি মারে কদর্য বর্ণবিদ্বেষ, তবে তার ফল যে কতটা মারাত্মক হতে পারে, হাড়ে হাড়ে টের পেলেন মেক্সিকোর এক শীর্ষ আধিকারিক। বিশ্বকাপের মঞ্চে এক দক্ষিণ কোরীয় ইনফ্লুয়েন্সারের পিছনে বসে তাঁর চেহারার আদল নিয়ে চূড়ান্ত অসভ্যতা করে নিজের সম্মান ও পদ— দুই-ই খোয়ালেন তিনি। সোশ্যাল মিডিয়ায় সেই ঘটনার ভিডিও ভাইরাল হতেই শুরু হয় তুমুল সমালোচনা। শেষমেশ চাপের মুখে পড়ে ওই আধিকারিককে পদ থেকে সরিয়ে দিতে বাধ্য হল তাঁর সংস্থা।
ঘটনার সূত্রপাত গত ১১ জুন। মেক্সিকোর গুয়াদালাজারা স্টেডিয়ামে চলছিল দক্ষিণ কোরিয়া ও চেক প্রজাতন্ত্রের হাড্ডাহাড্ডি ম্যাচ। সেই ম্যাচে দক্ষিণ কোরিয়া ২-১ গোলে জেতার পর গ্যালারিতে উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়েছিলেন কোরীয় সমর্থকরা। সেই মুহূর্তটি নিজের ক্যামেরাবন্দি করছিলেন ইয়ুন সু-জিন নামের এক জনপ্রিয় দক্ষিণ কোরীয় ইনফ্লুয়েন্সার, সোশ্যাল দুনিয়ায় যিনি ‘ইনকোক্যাট’ বা ‘ইনোনিয়াং’ নামেই বেশি পরিচিত। টিকটক ও ইউটিউব মিলিয়ে তাঁর অনুগামীর সংখ্যা প্রায় ৯০ লক্ষ! তিনি যখন নিজের ভিডিও রেকর্ডিংয়ে ব্যস্ত, ঠিক তখনই তাঁর পিছনের সিটে বসা এক মেক্সিকান ব্যক্তিকে দেখা যায় অত্যন্ত কদর্য একটি ভঙ্গি করতে। ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে হাসতে হাসতে দুই আঙুল দিয়ে নিজের চোখের কোণ টেনে ধরেন তিনি— যা বিশ্বজুড়ে এশীয়দের প্রতি এক পরিচিত বর্ণবিদ্বেষী ইঙ্গিত বা ‘স্ল্যান্ট-আই’ জেসচার হিসেবেই কুখ্যাত। বিষয়টি নজরে আসতেই দৃশ্যত অস্বস্তিতে পড়েন ইয়ুন।
পরে ইনস্টাগ্রামে সেই ভিডিও শেয়ার করে তিনি লেখেন, “আমি এতটা পথ পেরিয়ে মেক্সিকোতে বিশ্বকাপ দেখতে এসেছি, নাকি আমি একটু বেশিই সংবেদনশীল হয়ে পড়ছি?”। এই ভিডিও প্রকাশ্যে আসতেই সোশ্যাল মিডিয়ায় আছড়ে পড়ে নিন্দার ঝড়। মেক্সিকান নেটিজেনদের একাংশ থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক ক্রীড়ামহল— সকলেই এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানান। নেটিজেনদের তদন্তে দ্রুত ওই ব্যক্তির পরিচয়ও সামনে আসে। জানা যায়, তিনি সাধারণ কোনও দর্শক নন, বরং মেক্সিকোর জালিস্কো অ্যাসোসিয়েশন অফ সার্ভেয়ার্স অ্যান্ড জিওম্যাটিক্স ইঞ্জিনিয়ার্স-এর খোদ সভাপতি, উলিসেস ফার্নান্দো বার্নাল মিরামন্তেস। একজন দায়িত্বশীল পদে থাকা ব্যক্তির কাছ থেকে এমন আচরণ মেনে নিতে পারেনি কেউই। বিশ্বমঞ্চে মেক্সিকোর ভাবমূর্তি কালিমালিপ্ত করার অভিযোগে ওই আধিকারিকের শাস্তির দাবি ওঠে সর্বত্র। পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে তড়িঘড়ি আসরে নামে ওই সংস্থা।
সংগঠনের এক মুখপাত্র জানান, এই ঘটনায় তাঁরা গভীরভাবে লজ্জিত এবং বার্নালকে তাঁর পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তীব্র বিতর্কের জেরে পরে নিজের সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টে একটি ভিডিও বার্তার মাধ্যমে ক্ষমা চাইতেও বাধ্য হন ওই সদ্য-প্রাক্তন সভাপতি। বিশ্বকাপের মতো এক আন্তর্জাতিক ক্রীড়া উৎসব, যা বিভিন্ন দেশ, জাতি ও সংস্কৃতির মানুষকে এক সুতোয় বাঁধার বার্তা দেয়, সেখানে এমন ঘটনা নিঃসন্দেহে এক বড়সড় কলঙ্ক। যদিও মেক্সিকোর সাধারণ ফুটবল ভক্তদের অনেকেই কোরীয় সমর্থকদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে জয় উদযাপন করেছেন, তবে এক আধিকারিকের এই বোকামি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, খেলার মাঠে বর্ণবিদ্বেষের ভূত এখনও পুরোপুরি দূর করা যায়নি।













