ঝাড়গ্রাম মানেই এতদিন পর্যটকদের কাছে ছিল শাল-পিয়ালের গভীর অরণ্য, লালমাটির রাস্তা আর পাহাড়ি ঝরনার ডাক। কিন্তু সেই পরিচিত বেলপাহাড়ির বুকেই নিঃশব্দে নিজের পরিচয় গড়ে তুলছে আর এক বিস্ময়— চাতন পাহাড়, স্থানীয়দের ভাষায় চাতন ডুংরি। প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের সঙ্গে আদিম মানবের গুহা, স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস এবং প্রত্নতাত্ত্বিক রহস্য— এই তিনের অনন্য মেলবন্ধন এখন নতুন করে পর্যটকদের আগ্রহের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।
বেলপাহাড়ি থেকে কাঁকড়াঝোর যাওয়ার পথে বদাডি মোড় পেরিয়ে শালবনের ভিতর পাহাড়ি পথ ধরে প্রায় দু’শো মিটার উঠলেই চোখে পড়ে মাকড়া পাথরে গড়ে ওঠা তিনটি প্রাকৃতিক গুহা। বহু বছরের ক্ষয়ে তাদের শরীরে সময়ের দাগ স্পষ্ট, তবু সেই গুহাগুলোর ভিতরে আজও যেন লুকিয়ে আছে হারিয়ে যাওয়া এক যুগের নীরব সাক্ষ্য। স্থানীয়দের বিশ্বাস, এই গুহাগুলোই একসময় আদিম মানবের আশ্রয়স্থল ছিল। জনশ্রুতি আরও বলছে, ১৭৯৮ সালের -এর সময় বিদ্রোহী নেতা ইংরেজদের সঙ্গে সংঘর্ষে আহত হয়ে আত্মগোপন করেছিলেন এই গুহাতেই। ইতিহাস আর লোককথার সীমারেখা এখানে এসে যেন একাকার হয়ে যায়। চাতন পাহাড়ের গুরুত্ব শুধু লোকবিশ্বাসে সীমাবদ্ধ নয়, প্রত্নতত্ত্বের দিক থেকেও এই অঞ্চল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ষাটের দশকে প্রত্নগবেষক-এর নেতৃত্বে বেলপাহাড়ি অঞ্চলে সমীক্ষা চালিয়ে তাম্র-প্রস্তর যুগের বহু নিদর্শন উদ্ধার হয়েছিল। আশপাশের লালজল, তামাজুড়ি এবং তামলিমাঞ এলাকা থেকে মিলেছিল পাথরের লাঙল, তিরের ফলা, চপার, এমনকি তামার কুঠারও। গবেষকদের মতে, জঙ্গলমহলের এই বিস্তীর্ণ অঞ্চল একসময় প্রাগৈতিহাসিক মানববসতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল। চাতন ডুংরির মাথায় উঠে দাঁড়ালেই বোঝা যায়, কেন দিন দিন বাড়ছে পর্যটকদের ভিড়। দূরে সারি সারি পাহাড়, নীচে ঘন সবুজ শালবন, আর ঋতু বদলের সঙ্গে পাল্টে যাওয়া প্রকৃতির রং যেন চোখের সামনে এক জীবন্ত ক্যানভাস খুলে দেয়। বসন্তে পলাশের আগুনরঙা সৌন্দর্য গোটা পাহাড়কে অন্য এক আবহে মুড়ে ফেলে।
অনেক পর্যটকের মতে, পশ্চিমাঞ্চল বাংলার বুকেই যেন লুকিয়ে আছে উত্তরবঙ্গের পাহাড়ি সৌন্দর্যের এক ঝলক। তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি উদ্বেগও কম নয়। গুহার দেওয়াল ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যাচ্ছে। পর্যটকের সংখ্যা বাড়লেও এখনও পর্যাপ্ত অবকাঠামোর অভাব স্পষ্ট। নিরাপদ সিঁড়ি নেই, নেই তথ্যফলক বা সংরক্ষণের সুসংগঠিত ব্যবস্থা। স্থানীয়দের মতে, পরিকল্পিত উন্নয়ন ও সংরক্ষণ হলে চাতন পাহাড় শুধু পর্যটন মানচিত্রেই নয়, ঝাড়গ্রামের ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অন্যতম পরিচয় হয়ে উঠতে পারে। , বা -র পাশাপাশি এখন দ্রুত উঠে আসছে চাতন পাহাড়ের নামও। জঙ্গলমহলের গভীরে দাঁড়িয়ে এই পাহাড় যেন আজও নীরবে বলে চলে— পাথরের স্তব্ধ শরীরেও লুকিয়ে থাকে সভ্যতার বহু অনুচ্চারিত গল্প।














