শীতপ্রধান মহাদেশ হিসেবে যার বিশ্বজোড়া খ্যাতি, সেই ইউরোপের কপালেই এখন বিন্দু বিন্দু ঘাম। বিশ্ব উষ্ণায়নের জাঁতাকলে পড়ে ইউরোপের চেনা গ্রীষ্মকাল এখন কার্যত অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হয়েছে। পরিস্থিতি এতটাই বেগতিক যে, ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা’ স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছে— এবার থেকে ইউরোপের দেশগুলিকে শীতকালের ইনফ্লুয়েঞ্জা বা ফ্লু-র মতোই প্রতি বছর গরমের জন্যও আগে থেকে স্থায়ী পরিকাঠামো ও কোমর বেঁধে প্রস্তুতি রাখতে হবে। আপৎকালীন পরিস্থিতি ভেবে হাত গুটিয়ে বসে থাকার দিন শেষ। চলতি বছরের শুরুতেই ইউরোপের তাপমাত্রা সমস্ত পুরনো রেকর্ডকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দিয়েছে। জুনের শেষ থেকেই শুরু হওয়া তীব্র তাপপ্রবাহে নাজেহাল সাধারণ মানুষ, বিকল হচ্ছে পরিকাঠামো। গত রবিবার জার্মানি, চেক প্রজাতন্ত্র ও পোল্যান্ডে তাপমাত্রা চল্লিশ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছুঁয়ে ফেলায় থমকে গিয়েছিল পরিবহন ব্যবস্থা।
অন্যদিকে ফ্রান্সে জুনের গড় তাপমাত্রা যেখানে তিরিশ ডিগ্রি সেলসিয়াসের আশেপাশে থাকার কথা, সেখানে একটি শহরে পারদ চড়েছিল এক্কেবারে চুয়াল্লিশ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। তীব্র এই দাবদাহের কারণে ফ্রান্সে ইতিমধ্যেই প্রায় এক হাজার জন মানুষের অতিরিক্ত মৃত্যু হয়েছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্ভাগ্যবশত এই ভয়াবহ তাপমাত্রাই এখন ইউরোপের নতুন বাস্তব বা ‘নিউ নর্মাল’। ‘ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশন’-এর গবেষণা বলছে, ১৯৭৬ সালের জুনের তুলনায় বর্তমান তাপপ্রবাহ প্রায় সাড়ে তিন ডিগ্রি বেশি গরম এবং পঞ্চাশ বছর আগে এই ধরনের চরম আবহাওয়া কল্পনাও করা যেত না। রিডিং ইউনিভার্সিটির আবহাওয়াবিদ ডক্টর অক্ষয় দেওরাস একটি সাক্ষাৎকারে রসিকতা করে বলেছেন, ব্যাপারটা এমন একটা দৌড় প্রতিযোগিতার মতো, যেখানে ফিনিশিং লাইনটাকে আচমকা শুরুর লাইনের অনেক কাছে নিয়ে চলে আসা হয়েছে।
অর্থাৎ, যা আগে শতাব্দীতে একবার ঘটত, তা এখন প্রতি কয়েক দশকেই ফিরে ফিরে আসবে। ইউরোপ কেন বাকি বিশ্বের চেয়ে বেশি পুড়ছে, তার পিছনে রয়েছে দুটি মূল কারণ। প্রথমত, একটি উচ্চ-চাপ বলয় বা ‘হিট ডোম’ ইউরোপের আকাশে থিতু হয়ে বসে রয়েছে, যা গরম বাতাসকে এক জায়গায় বন্দি করে রাখছে। দ্বিতীয়ত, আশির দশকের পর থেকে ইউরোপ বাকি বিশ্বের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ গতিতে উত্তপ্ত হচ্ছে। ‘কোপারনিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিস’-এর তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ইউরোপের পঁচানব্বই শতাংশেরও বেশি এলাকায় স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। অধ্যাপক হানা ক্লোকের মতে, আমরা আজ যে গরমের ঠেলা সামলাচ্ছি, তা আসলে কয়েক দশক আগের দূষণের ফল।
জলবায়ু ব্যবস্থা সাড়া দিতে কিছুটা সময় নেয়, তাই অতীতের কাজের পরিণতি এখন ভোগ করতে হচ্ছে। আল্পস পর্বতমালার হিমবাহগুলি ইতিমধ্যেই এমনভাবে গলে গিয়েছে যে সেগুলিকে আর আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া অসম্ভব, যার ফলে গ্রীষ্মকালে ইউরোপের নদীগুলির জলপ্রবাহ স্থায়ীভাবে কমে গিয়েছে। ইউরোপের এই চরম গরমে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মানুষের স্বাস্থ্য। চব্বিশ সালেই এই অঞ্চলে গরমে প্রায় বাষট্টি হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আঞ্চলিক অধিকর্তা ডক্টর হ্যান্স ক্লুগে এক অদ্ভুত সমস্যার কথা তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, ইউরোপের বাড়িঘরগুলোর স্থাপত্যই তৈরি হয়েছিল শীতপ্রধান জলবায়ুর কথা মাথায় রেখে— অর্থাৎ, বাড়িগুলো এমনভাবে তৈরি যা ঘরের ভেতরের গরম ধরে রাখে, বের করে না। এখন সেই বাড়িগুলোই বাসিন্দাদের জন্য এক একটা বদ্ধ ওভেন হয়ে উঠেছে।
ডক্টর ক্লুগে বলেন, সরকারগুলোকে এখন গরমের জন্য এমনভাবে পরিকল্পনা করতে হবে যা প্রতি বছর আসবেই। এটি কোনও আচমকা বিপর্যয় নয়, বরং নিয়মিত পরিকাঠামোর বিষয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি সামাল দিতে দুটি বিষয়ে অবিলম্বে নজর দেওয়া দরকার। প্রথমত, নিখুঁত এবং দ্রুত সতর্কবার্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যাতে একা থাকা বয়স্ক মানুষদের কাছে গরমের তীব্রতা বাড়ার আগেই সাহায্য পৌঁছানো যায়। দ্বিতীয়ত, পুরনো রীতিনীতি বদলে জল ও আবাসন পরিকাঠামোর আধুনিকীকরণ করা। আগামী দিনের ইউরোপের গ্রীষ্মকাল কতটা ভয়াবহ হবে, তা কিন্তু আজ আমরা কতটা কার্বন নিঃসরণ কমাচ্ছি এবং কতটা প্রস্তুতি নিচ্ছি— তার ওপরেই নির্ভর করছে।














