ভারতের দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতিতে নিজেদের অংশীদারিত্বকে নতুন মাত্রায় নিয়ে যেতে ভারতে আরও অতিরিক্ত দুই হাজার পাঁচশত কোটি মার্কিন ডলার বা পঁচিশ বিলিয়ন ডলার সরাসরি বিনিয়োগ করার স্পষ্ট বার্তা দিল সংযুক্ত আরব আমিরশাহি। একই সঙ্গে আগামী দুই হাজার বত্রিশ সালের মধ্যে দুই দেশের মধ্যকার পারস্পরিক দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যকে দ্বিগুণ করে বিশ হাজার কোটি ডলার অর্থাৎ দুইশত বিলিয়ন ডলারে নিয়ে যাওয়ার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা স্থির করা হয়েছে। সোমবার মুম্বইয়ে আয়োজিত ভারত ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহির চতুর্দশ উচ্চস্তরীয় যৌথ বিনিয়োগ টাস্ক ফোর্সের বৈঠকের পর যৌথ সাংবাদিক সম্মেলনে কেন্দ্রীয় বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী পীযূষ গয়াল এই সিদ্ধান্তের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন।
বিশ্ব অর্থনীতির দ্রুততম অগ্রগতির দেশ হিসেবে ভারতের টেকসই উন্নয়ন যাত্রায় পশ্চিম এশিয়ার এই বন্ধুরাষ্ট্র এক অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য ও পরীক্ষিত অংশীদার বলে তিনি মন্তব্য করেন। আবুধাবি ইনভেস্টমেন্ট অথরিটির ম্যানেজিং ডিরেক্টর শেখ হামেদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান এবং পীযূষ গয়ালের যৌথ সভাপতিত্বে আয়োজিত এই শীর্ষ বৈঠকে দুই দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি বা ‘সেপা’-র কার্যকারিতা পর্যালোচনা করা হয়। ২০১৩ সালে গঠিত এই যৌথ টাস্ক ফোর্সের বৈঠকের খতিয়ান তুলে ধরে পীযূষ গয়াল জানান, আমিরশাহি ইতিমধ্যেই ভারতে প্রায় দুই হাজার পাঁচশত কোটি ডলার বিনিয়োগ করে দেশের সপ্তম বৃহত্তম সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগকারী রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে।
উভয় দেশের দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য হলো ভারতে আমিরশাহির মোট বিনিয়োগকে শেষ পর্যন্ত দশ হাজার কোটি ডলারে উন্নীত করা; যার পরবর্তী ধাপ হিসেবে খুব শীঘ্রই আরও পঁচিশ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হতে চলেছে। বিগত ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ পৌঁছেছিল দশ হাজার একশত পঁচিশ কোটি ডলারে এবং শুধুমাত্র তেল-বহির্ভূত বাণিজ্যই হয়েছিল সাত হাজার ছয়শত কুড়ি কোটি ডলারের। এই বিনিয়োগ ও বাণিজ্যের পরিধি শুধু গতানুগতিক পণ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; বন্দর নির্মাণ, জাহাজ তৈরি, মহাকাশ গবেষণা, স্টার্টআপ ক্ষেত্র এবং ভারতীয় শেয়ার বাজারে আমিরশাহির পুঁজি লগ্নির ক্ষেত্র প্রস্তুত হচ্ছে। অন্য দিকে ভারতও জ্বালানি, পরিকাঠামো, সরবরাহ শৃঙ্খল, কৃত্রিম মেধা এবং খাদ্য সুরক্ষার মতো কৌশলগত ক্ষেত্রে আমিরশাহিকে বড় সুযোগ করে দিচ্ছে।
বৈঠকে গুজরাটের মেগা ফুড পার্ক প্রকল্পের অগ্রগতি এবং ২০২৬ সাল শেষ হওয়ার আগেই সংযুক্ত আরব আমিরশাহিতে ‘ইনভেস্ট ইন্ডিয়া’র নতুন দপ্তর পুরোদমে চালু করার বিষয়ে সহমত প্রকাশ করা হয়। পাশাপাশি ভারতের বেসরকারি আরবিএল ব্যাঙ্কের সংখ্যাগরিষ্ঠ শেয়ার কিনতে এমিরেটস এনবিডি-র প্রায় তিনশত কোটি ডলারের অধিগ্রহণ, সম্মান ক্যাপিটালে ইন্টারন্যাশনাল হোল্ডিং কোম্পানির একশত কোটি ডলারের লগ্নি এবং ওড়িশায় একটি সমন্বিত অ্যালুমিনিয়াম কারখানা গড়তে এক হাজার একশত পঞ্চাশ কোটি ডলারের যৌথ বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতির অগ্রগতিও খতিয়ে দেখা হয়েছে। এছাড়া গুজরাটের গিফট সিটিতে মাশরেক ব্যাঙ্ক, ফার্স্ট আবুধাবি ব্যাঙ্ক এবং আবুধাবি ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির শাখা খোলার সিদ্ধান্তকেও স্বাগত জানানো হয়েছে। দুই দেশের নিজস্ব মুদ্রায় লেনদেন, কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের ডিজিটাল মুদ্রা সংযোগ এবং সার্বিক আর্থিক পরিকাঠামোকে বিশ্বস্তরে সংহত করার ক্ষেত্রেও বড় অগ্রগতি হয়েছে।
সবচেয়ে সুদূরপ্রসারী কৌশলগত সমঝোতা গড়ে উঠছে দেশের জ্বালানি সুরক্ষার ক্ষেত্রে। ভারতের স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভস লিমিটেড এবং আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানির মধ্যে সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী, ভারতের ভূগর্ভস্থ কৌশলগত তেল ভাণ্ডারে আমিরশাহি তিন কোটি ব্যারেল পর্যন্ত অপরিশোধিত খনিজ তেল মজুত করতে পারবে। অন্ধ্রপ্রদেশের বিশাখাপত্তনম এবং ওড়িশার চণ্ডীখোলকে এই তেল মজুতের প্রাথমিক স্থান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালীর বাইরে অবস্থিত আমিরশাহির প্রধান তেলকেন্দ্র ফুজাইরাতে ভারতের নিজস্ব কৌশলগত তেল মজুত রাখার বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে; যার মূল উদ্দেশ্য হলো পশ্চিম এশিয়ায় ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হলেও যেন ভারতের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় কোনো বিঘ্ন না ঘটে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী এলএনজি এবং এলপিজি গ্যাস আমদানির সুরক্ষাতেও আমিরশাহিকে প্রধান স্তম্ভ হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে নয়াদিল্লি।
সমুদ্রপথে পরিকাঠামোগত বিপ্লব আনতে দেশের বন্দর সক্ষমতা আগামী এক দশকে দ্বিগুণ করার পরিকল্পনা নিয়েছে কেন্দ্র। মহারাষ্ট্রের বধবান বন্দর ছাড়াও পূর্ব ও পশ্চিম উপকূলের বন্দরগুলির আধুনিকীকরণ ও সম্প্রসারণে আমিরশাহির পুঁজিকে স্বাগত জানানো হয়েছে। এই লক্ষ্যে জাহাজ মালিকানা, আধুনিক বন্দর নির্মাণ, জাহাজ নির্মাণ, জাহাজ মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ, জাহাজ ভাঙা এবং কন্টেনার তৈরি—এই ছয়টি সুনির্দিষ্ট ক্ষেত্রে যৌথ কার্যকরী দল গঠন করা হচ্ছে, যার নেতৃত্ব দেবে ভারতের বন্দর ও নৌপরিবহণ মন্ত্রক। এ ছাড়াও গুজরাটের ধোলেড়াতে একটি আন্তর্জাতিক বিমান ও সরবরাহ কেন্দ্র গড়ে তোলা এবং আবুধাবির সঙ্গে ভারতের বিমান যোগাযোগ বৃদ্ধির মতো নানামুখী পরিকাঠামো নির্মাণে দুই দেশের এই মেগা অর্থনৈতিক রূপরেখা এক ঐতিহাসিক দিশা দেখাতে চলেছে।














