দিয়েগো মারাদোনার সেই ঐতিহাসিক ‘হ্যান্ড অব গড’ থেকে শুরু করে ২০০৬ সালের ফাইনালে জিনেদিন জিদানের বিতর্কিত হেডবাট—বিশ্বকাপ ফুটবলের ইতিহাসের বহু স্মরণীয় মুহূর্ত স্টেডিয়ামে বসে স্বচক্ষে দেখেছেন কলকাতার ৭৭ বছর বয়সি প্রবীণ ফুটবলপ্রেমী দীপক নন্দী। তবে শনিবার তিনি এক বিরল মুহূর্তের সাক্ষী হতে চলেছেন নিজের ঘরের মাঠেই, যেখানে প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচে ভারতের মুখোমুখি হতে চলেছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল।
টানা ১১টি বিশ্বকাপ মাঠে বসে দেখা এই ফুটবলপ্রেমী অবশ্য এদিন যুবভারতী বা স্টেডিয়ামে না গিয়ে নিজের ঘরের টেলিভিশনের পর্দাতেই ঐতিহাসিক এই লড়াইয়ের আনন্দ উপভোগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ফুটবলের প্রতি দীপকবাবুর এই অবিশ্বাস্য ভালোবাসার সূচনা হয়েছিল ১৯৬৬ সালে। কিংবদন্তি ভারতীয় ফুটবলার ও কোচ অমল দত্ত ইংল্যান্ড বিশ্বকাপ থেকে ভিডিও রিল কলকাতায় নিয়ে আসার পর তা দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন তরুণ দীপক। সেদিনই মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, একদিন তিনি মাঠে বসে সরাসরি বিশ্বকাপ দেখবেন। সেই স্বপ্ন সত্যি হয় ১৯৮৬ সালে, এক বন্ধুর আমন্ত্রণে মেক্সিকো বিশ্বকাপে পা রেখে।
সে যুগে পাসপোর্ট তৈরিতে চার-পাঁচ মাস সময় লাগলেও নানা চেষ্টায় মাত্র ১৫ দিনে পাসপোর্ট বের করে মেক্সিকো পৌঁছে গিয়েছিলেন তিনি। সেই থেকে শুরু করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডায় আয়োজিত ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ পর্যন্ত টানা ১১টি টুর্নামেন্টের কোনোটিই তিনি হাতছাড়া করেননি। তাঁর সোনালী স্মৃতির ঝুলিতে সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে মারাদোনার খেলা সাতটি ম্যাচ। ১৯৮৬-র ইংল্যান্ড ম্যাচে মারাদোনার সেই বিতর্কিত হ্যান্ডবল এবং মাঝমাঠ থেকে একা বল টেনে নিয়ে অবিশ্বাস্য গোল তিনি দেখেছেন গ্যালারিতে বসে। এমনকি পেলে ও মারাদোনার তুলনা উঠলে তিনি যে তীব্র দ্বিমত পোষণ করেন, তাও অকপটে স্বীকার করেছেন। পাশাপাশি ব্রাজিলের বর্তমান কোচ কার্লো আনচেলত্তিকে তিনি যখন মাঠে ইতালির জার্সিতে খেলতে দেখেছিলেন, সেই স্মৃতিও তাঁর মনে আজও সতেজ।
শারীরিক সামর্থ্য ও আর্থিক সংস্থান থাকলে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত প্রতিটি বিশ্বকাপে মাঠে থাকার সংকল্প প্রকাশ করে দীপক নন্দী জানান, বিশ্বজুড়ে মাঠে বসে খেলা দেখতে গিয়ে তিনি যত অর্থ ব্যয় করেছেন, তা দিয়ে অনায়াসেই কলকাতায় বিশাল অট্টালিকা বানিয়ে ফেলা যেত; কিন্তু এ নিয়ে তাঁর কোনো অনুশোচনা নেই, বরং তিনি গর্বিত। বিশ্বমঞ্চে ভারতের সাফল্য না পাওয়ার কারণ হিসেবে দেশের চরম আর্দ্র ও উষ্ণ আবহাওয়া, ফুটবলের তুলনায় ক্রিকেটের আধিপত্য এবং পরিকাঠামোগত দুর্বলতাকেই দায়ী করেছেন এই ফুটবলপাগল বাঙালি। ঘরের শহরে প্রিয় ব্রাজিল দল ভারতের মুখোমুখি হওয়াকে নিজের দীর্ঘ ফুটবলপ্রেমী জীবনের এক পরম প্রাপ্তি বলেই মনে করছেন তিনি।














