Facebook
Twitter
LinkedIn
Threads
X
Email
WhatsApp
Telegram
StumbleUpon
Pinterest
Skype
Pocket

ধানের বদলে চাল ফলত, জনশ্রুতি ঘিরে আজও বিস্ময় ঘোষগ্রামের লক্ষ্মীপুজো

ধানের বদলে চাল ফলত, জনশ্রুতি ঘিরে আজও বিস্ময় ঘোষগ্রামের লক্ষ্মীপুজো

কোজাগরী পূর্ণিমা মানেই বাংলার ঘরে ঘরে ধনদেবী লক্ষ্মীর আরাধনা। কিন্তু বীরভূমের ময়ূরেশ্বরের ঘোষগ্রামে ছবিটা একেবারেই আলাদা। এখানে বাড়িতে বাড়িতে লক্ষ্মীপুজোর প্রচলন নেই। গ্রামের প্রাচীন মন্দিরেই সমবেত হন বাসিন্দারা। শুধু ঘোষগ্রাম নয়, আশপাশের প্রায় ৫২টি গ্রামের মানুষের কাছেও এই পুজো বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। প্রাচীন ঐতিহ্য, সাধকের সাধনা আর নানা লোককথার মেলবন্ধনে আজও স্বতন্ত্র পরিচয় ধরে রেখেছে ঘোষগ্রামের সর্বজনীন লক্ষ্মীপুজো।

 

স্থানীয় জনশ্রুতি, এই পুজোর ইতিহাস দেড় হাজার বছরেরও বেশি পুরনো। রাজা হর্ষবর্ধনের আমল থেকেই দেবীর আরাধনা হয়ে আসছে বলে বিশ্বাস অনেকের। যদিও এই দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক নথির উল্লেখ নেই, তবু বংশপরম্পরায় চলে আসা বিশ্বাস ও রীতিই এই পুজোর প্রধান আকর্ষণ।ঘোষগ্রামের লক্ষ্মীপুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে সাধক কামদেব ব্রহ্মচারীর নাম। প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, দেবী সাধনার উপযুক্ত স্থান খুঁজতে খুঁজতে রাঢ় বাংলার এই অঞ্চলে পৌঁছন তিনি। কিছুদিন বীরচন্দ্রপুরের একচক্রধামে থাকার পর বর্ষার সময় নদী পেরিয়ে ঘোষগ্রামে আসেন। ক্লান্ত সাধক আশ্রয় নেন একটি নিমগাছের নীচে।সেখানেই শুরু হয় তাঁর সাধনা। লোকবিশ্বাস, দীর্ঘ সাধনার পর স্বপ্নে দেবী লক্ষ্মীর দর্শন পান তিনি।

 

দেবীর নির্দেশেই ওই স্থানে মূর্তি প্রতিষ্ঠা করে পুজো শুরু হয়।কিন্তু দেবীর মূর্তি তৈরি হবে কী দিয়ে? এই প্রশ্নের উত্তর ঘিরেও রয়েছে এক অলৌকিক কাহিনি। কথিত আছে, গ্রামের সজল ঘোষ নামে এক কৃষক পুকুরে ভাসতে থাকা শ্বেতপদ্ম তুলতে গিয়ে বারবার ব্যর্থ হন। পরে স্বপ্নাদেশ পেয়ে সাধকের কাছে যান তিনি। এরপর কোজাগরী পূর্ণিমার রাতে সাধক ও ওই কৃষক একসঙ্গে পুকুর থেকে শ্বেতপদ্ম এবং একটি ভাসমান কাঠখণ্ড সংগ্রহ করেন। সেই কাঠের উপর গঙ্গামাটি দিয়ে তৈরি হয় দেবীর মূর্তি। জনশ্রুতি, সেই থেকেই ঘোষগ্রামে লক্ষ্মীপুজোর সূচনা। পরবর্তী সময়ে এই পুজোর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে দূরদূরান্তে। স্থানীয় কাহিনি অনুযায়ী, মুর্শিদাবাদের কান্দির রাজাও এই পুজোর কথা জানতে পেরে মন্দির প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন।এই পুজোকে ঘিরে সবচেয়ে চমকপ্রদ লোককথা, একসময় নাকি ঘোষগ্রামে ধানের বদলে সরাসরি চাল ফলত! দেবী লক্ষ্মীর কৃপায় গ্রাম ছিল শস্যে-সমৃদ্ধ।

 

সেই বিশ্বাসের প্রতিফলন দেখা যেত দেবীর প্রতিমাতেও। স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিন প্রতিমায় চালের শিষ রাখার রীতি প্রচলিত ছিল। কৃষিনির্ভর জনজীবনে লক্ষ্মীকে শস্য, প্রাচুর্য ও সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবে দেখার যে ঐতিহ্য, ঘোষগ্রামের এই লোককথা তারই এক ব্যতিক্রমী প্রকাশ।পুজোর আচারেও রয়েছে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য। কোজাগরী পূর্ণিমায় সকাল থেকে শুরু হয় বিশেষ পুজো-অর্চনা। দেবীর আরাধনায় ব্যবহৃত হয় নবঘট, অর্থাৎ নটি ঘট। রাতে আয়োজন করা হয় মহাযজ্ঞ। সেই যজ্ঞে ১০৮টি ক্ষীরের নাড়ু আহুতি দেওয়ার রীতি রয়েছে। তবে অন্যান্য অনেক পুজোর মতো এখানে যজ্ঞে বেলপাতা আহুতি দেওয়া হয় না।মন্দিরে সারা বছর নিত্যপুজো হলেও নির্দিষ্ট কয়েক দিন বন্ধ থাকে দরজা। স্থানীয় বিশ্বাস, আশ্বিন মাসের ২৮ তারিখ থেকে কার্তিক মাসের ২ তারিখ পর্যন্ত চার দিন দেবী জগৎ পরিক্রমায় বের হন।

 

সেই সময় মন্দির বন্ধ রাখা হয়। কোনও বছর ওই সময়ের মধ্যে কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো পড়লে প্রচলিত রীতি মেনে পুজোও হয় না বলে জানান স্থানীয়রা।বাড়ির চৌকাঠে ব্যক্তিগত আরাধনার বদলে ঘোষগ্রামে গুরুত্ব পেয়েছে সমবেত উপাসনা। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই ঐতিহ্য গ্রামের সামাজিক ঐক্য ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত। সময় বদলেছে, বদলেছে জীবনযাত্রা। কিন্তু প্রাচীন মন্দিরকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বিশ্বাসে আজও ভাটা পড়েনি। কোজাগরী পূর্ণিমায় তাই ঘোষগ্রামে লক্ষ্মী শুধু কোনও একটি পরিবারের দেবী নন, তিনি বহু গ্রামের মানুষের সম্মিলিত বিশ্বাস ও ঐতিহ্যের প্রতীক।

READ MORE.....