বঙ্গোপসাগরে দানা বাঁধা গভীর নিম্নচাপটি দ্রুত শক্তি বাড়িয়ে অতি গভীর নিম্নচাপে পরিণত হয়েছে এবং তা ক্রমশ ঘূর্ণিঝড়ের রূপ নিচ্ছে। আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী ২৮ অক্টোবর এই ঘূর্ণিঝড়টি অতি তীব্র আকারে অন্ধ্রপ্রদেশ উপকূলের কাছাকাছি আছড়ে পড়তে চলেছে। এর নামকরণ করা হয়েছে ‘অর্ণব’। যদিও এই ঝড়ের মূল অভিমুখ অন্ধ্রপ্রদেশের উপকূলের দিকে, তবুও এর বিশাল মেঘপুঞ্জের পরোক্ষ প্রভাবে পশ্চিমবঙ্গও এর হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না।
বিশেষ করে দক্ষিণবঙ্গের উপকূলবর্তী জেলাগুলিতে এর বড় ধরনের প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আগামী ২৭ অক্টোবর থেকেই দক্ষিণবঙ্গের আবহাওয়ায় বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা দিতে শুরু করবে। ওই দিন পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা, কলকাতা, হাওড়া, হুগলি এবং ঝাড়গ্রামে হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে। তবে পরিস্থিতি আরও জটিল ও উদ্বেগজনক রূপ নিতে পারে ২৮ ও ২৯ অক্টোবর। বিশেষ করে দক্ষিণ ২৪ পরগনা, দুই মেদিনীপুর এবং ঝাড়গ্রামে দমকা হাওয়ার সঙ্গে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস জারি করা হয়েছে। পরবর্তীতে এই বৃষ্টির প্রভাব বাঁকুড়া ও পুরুলিয়া জেলাতেও ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে ইতিমধ্যেই প্রশাসন সুন্দরবন উপকূলে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করেছে। ২৭ অক্টোবর থেকে পরবর্তী নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত সমুদ্রে যাওয়া মৎস্যজীবীদের ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে এবং ২৬ অক্টোবর সন্ধ্যার মধ্যে সমস্ত ট্রলার ও নৌকাকে নিরাপদ উপকূলে ফিরিয়ে আনার কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
উপকূলবর্তী এলাকায় সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে পুলিশ ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্থল ও জলপথে লাগাতার মাইকিং চালানো হচ্ছে। পাশাপাশি, সম্ভাব্য যেকোনো বিপদের মোকাবিলা করতে বকখালি, গঙ্গাসাগর ও মৌশুনি দ্বীপের মতো সংবেদনশীল এলাকাগুলিতে সিভিল ডিফেন্সের কর্মীদের বিশেষভাবে মোতায়েন করা হয়েছে। সমগ্র পরিস্থিতির উপর কড়া নজর রাখছে জেলা প্রশাসন। এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের আশঙ্কায় তীব্র দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন সুন্দরবনের হাজার হাজার মৎস্যজীবী ও উপকূলবাসী। সুন্দরবন মৎস্যজীবী শ্রমিক ইউনিয়নের সম্পাদক সতীনাথ পাত্র এই বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “ঝড়-বৃষ্টির পূর্বাভাস পেলেই প্রশাসন আমাদের ট্রলার ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দেয়, যা সুরক্ষার জন্য অবশ্যই জরুরি। কিন্তু বারবার এই ধরনের দুর্যোগ নেমে আসায় আমাদের রুটি-রুজিতে মারাত্মক টান পড়ছে। মাঝসমুদ্রে মাছ ধরতে না যাওয়ার কারণে পরিবার নিয়ে চরম অর্থনৈতিক সংকটে পড়তে হয় মৎস্যজীবীদের।”
অন্যদিকে, স্থানীয় মৎস্যজীবী গণেশ দাস আক্ষেপের সুরে জানান, “প্রশাসনের মাইকিং শুনলেই বুক কেঁপে ওঠে। এই সময়ে সমুদ্রে যেতে না পারলে আমাদের সংসার কীভাবে চলবে জানি না। সারা বছর সাগরের ওপর নির্ভর করেই আমাদের জীবন ও জীবিকা চলে। বারবার এমন নিম্নচাপ ও ঘূর্ণিঝড়ের কারণে আমাদের নৌকা ও জালেরও অনেক ক্ষতি হয়। সরকারের পক্ষ থেকে আমাদের স্থায়ী সুরক্ষার পাশাপাশি বিকল্প কর্মসংস্থানের স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা করা দরকার।”
প্রশাসনের কঠোর নজরদারি এবং মৎস্যজীবীদের সতর্কতা সত্ত্বেও উপকূলের সাধারণ মানুষের মনে দুর্যোগের কালো মেঘ ও দুশ্চিন্তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।














