Facebook
Twitter
LinkedIn
Threads
X
Email
WhatsApp
Telegram
StumbleUpon
Pinterest
Skype
Pocket

কারাকাসে ট্রাম্পের ‘কোম্পানি’ রাজ

কারাকাসে ট্রাম্পের ‘কোম্পানি’ রাজ

মধ্যরাতের নিস্তব্ধতা চিরে কারাকাসের আকাশ কেঁপে উঠল মার্কিন যুদ্ধবিমানের গর্জনে। হলিউড চিত্রনাট্যকেও হার মানানো এক ঝটিকা অভিযানে ভেনেজ়ুয়েলার প্রেসিডেন্সিয়াল প্যালেস থেকে কার্যত বিছানা থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হলো প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে। কোনো আলাপ-আলোচনা নয়, কোনো কূটনৈতিক হুঁশিয়ারি নয়, ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি নির্দেশে একটি সার্বভৌম দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে মার্কিন মুলুকে উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হলো বন্দি হিসেবে। বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা আধুনিক ভূ-রাজনীতিতে এক ‘নয়া সাম্রাজ্যবাদ’-এর উদয় ঘটিয়েছে। যেখানে গণতন্ত্রের মুখোশ খুলে এখন সামনে চলে এসেছে স্রেফ সম্পদের দখল নেওয়ার উলঙ্গ বাসনা। দুই শতাব্দী আগে রবার্ট ক্লাইভরা যেভাবে বাণিজ্যের অছিলায় বন্দুকের নলে ভারত দখল করেছিল, কারাকাসের এই রাত যেন সেই ইতিহাসেরই এক ডিজিটাল সংস্করণ।

মার্কিন বিদেশনীতির এই আমূল বদলে স্তম্ভিত গোটা বিশ্ব। এতদিন ইরাক, লিবিয়া বা আফগানিস্তানে হস্তক্ষেপের সময় ওয়াশিংটন অন্তত ‘গণতন্ত্র রক্ষা’ বা ‘মানবাধিকার’-এর কথা বলত। সাদ্দাম হোসেনের সময় তো রাসায়নিক অস্ত্রের এক কাল্পনিক অজুহাতও খাড়া করা হয়েছিল। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের এই অভিযানে সেই ভণিতার ছিটেফোঁটাও নেই। মার্কিন প্রেসিডেন্ট রাখঢাক না করেই স্পষ্ট করে দিয়েছেন, তাঁর লক্ষ্য মাদুরোর পদচ্যুতি নয়, বরং ভেনেজ়ুয়েলার মাটির নিচে থাকা বিপুল তেলের ভাণ্ডার। মাদুরোকে সরিয়ে তাঁরই ঘনিষ্ঠ রড্রিগেজ়কে ক্ষমতায় বসিয়ে রাখা কার্যত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ‘পুতুল রাজা’ বসানোর কৌশলের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। রবীন্দ্রনাথের সেই সতর্কবার্তা, ‘বণিকের মানদণ্ড দেখা দিল রাজদণ্ড রূপে’ আজ যেন কারাকাসের রাজপথে আক্ষরিক অর্থেই সত্যি হয়ে উঠেছে।

আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা না করেই এই সামরিক অভিযান চালানো হয়েছে। রাষ্ট্রপুঞ্জের সনদ অনুযায়ী কোনো স্বাধীন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে এভাবে তুলে আনা যুদ্ধাপরাধের শামিল। অথচ ট্রাম্প নিজের দেশের কংগ্রেসের অনুমোদনেরও প্রয়োজন বোধ করেননি। শুধুমাত্র একটি ‘একজিকিউটিভ অর্ডার’ বা প্রশাসনিক নির্দেশই যথেষ্ট ছিল একটি দেশের সার্বভৌমত্বকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার জন্য। মাদুরো গণতান্ত্রিক ভাবে নির্বাচিত কি না, সেই বিতর্ক থাকলেও আন্তর্জাতিক আইনের চোখে তিনি একটি দেশের প্রধান। তাঁকে এভাবে অপহরণ করা আসলে ‘কর্পোরেট রেইড’-এর নামান্তর। শক্তিশালী পক্ষ যেভাবে গায়ের জোরে দুর্বল পক্ষের সম্পত্তি দখল করে, ঠিক সেই কায়দাতেই ভেনেজ়ুয়েলার তেলক্ষেত্রগুলি এখন হোয়াইট হাউসের নিয়ন্ত্রণে।

এই ঘটনা ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলির জন্যও অশনি সঙ্কেত বয়ে আনছে। ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আমেরিকা নিজে যখন সব নিয়ম ভাঙছে, তখন চিন বা রাশিয়ার মতো দেশগুলিকেও আটকানোর আর কোনো নৈতিক অধিকার তাদের রইল না। কাল যদি বেজিং তাইওয়ান দখল করে নেয় বা ভারতের লাদাখ সীমান্তে আগ্রাসন বাড়ায়, তবে ওয়াশিংটন আর কোন মুখে বাধা দেবে? একইভাবে পুতিন যদি ইউক্রেনে ঢুকে জেলেনস্কিকে তুলে নিয়ে যান, তবে তাকেও আর অবৈধ বলার পথ রইল না। আমেরিকা নিজেই আজ ‘বিশ্ব পুলিশ’ থেকে ‘বিশ্বের লুটেরা’র ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে সেই বিপজ্জনক রাস্তা খুলে দিল।

পশ্চিম গোলার্ধে কোনো বিরোধী শক্তিকে বরদাস্ত করা হবে না— ট্রাম্পের এই হুঙ্কার যেন আধুনিক জামানার একচেটিয়া বাণিজ্যের ফরমান। লাতিন আমেরিকাকে আমেরিকা এখন নিজের ‘জমিদারি’ বলে মনে করছে। তেল, খনিজ সম্পদ বা কৌশলগত অবস্থান থাকলে এখন আর কোনো ছোট দেশই নিরাপদ নয়। গণতন্ত্র বা সার্বভৌমত্ব এখন তেলের ব্যারেলের নিচে চাপা পড়ে গিয়েছে। ভেনেজ়ুয়েলার এই ঘটনা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, পৃথিবী আবার সেই ‘জোর যার মুলুক তার’ নীতিতে ফিরছে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বিদায় নিলেও তাদের সেই সাম্রাজ্যবাদী প্রেতাত্মা এখন হোয়াইট হাউসের অন্দরে বাসা বেঁধেছে। কারাকাসের অপারেশন কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি উন্নয়নশীল বিশ্বের জন্য এক চরম নিরাপত্তাহীনতার বিজ্ঞাপন। ছবি : সোশ্যাল মিডিয়া ।

READ MORE.....