‘কাজের সময়ে কাজী, কাজ ফুরোলে পাজি’—আক্ষেপের এই সুর এখন বাংলাদেশের বাতাসে। এক বছর আগের সেই তপ্ত রাজপথ, পুলিশের বুলেট আর লাঠির মুখে জেন-জি বা জেনারেশন জেডের যে হুঙ্কার শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটিয়েছিল, ভোটের আবহে সেই গর্জন যেন আজ কিছুটা ম্লান। ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচন শিয়রে, কিন্তু ক্ষমতার অলিন্দে নতুন কোনো মুখ নয়, বরং সেই পুরনো রাজনৈতিক শক্তিরই দাপট দেখছে ওপার বাংলা। স্বপ্ন ছিল এক ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়ার, যেখানে বংশানুক্রমিক রাজনীতির অবসান ঘটবে। কিন্তু বাস্তব বলছে অন্য কথা। মাঠ দখলে এখন মূলত খালেদা জিয়ার বিএনপি এবং জামাত-ই-ইসলামী।
বাংলাদেশের প্রায় ১২.৮ কোটি ভোটারের চারভাগের একভাগই তরুণ। জুলাই-অভ্যুত্থানের প্রধান কারিগর তারাই। কিন্তু ভোটের সমীকরণে সেই বিপ্লবীদের একাংশই আজ বিভ্রান্ত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাদমান মুজতবা রাফিদ যেমন স্পষ্ট জানালেন তাঁর মনভঙ্গের কথা। রাফিদ বলছেন, ‘আমরা এমন একটা দেশের স্বপ্ন দেখেছিলাম যেখানে লিঙ্গ, ধর্ম, জাতিগত পরিচয় নির্বিশেষে সবাই সমান সুযোগ পাবে। কিন্তু সেই কাঙ্ক্ষিত সংস্কার তো দূরের কথা, বাস্তবতা আমাদের স্বপ্ন থেকে অনেক দূরে।’ এই ক্ষোভ কেবল রাফিদের নয়, ছড়িয়ে পড়েছে দেশের বিশাল তরুণ প্রজন্মের মধ্যে।
বিপ্লবের পর এক বুক আশা নিয়ে জন্ম নিয়েছিল ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’ (এনসিপি)। ভেবেছিল নতুন রাজনীতির বীজ বুনবে তারা। কিন্তু ডিসেম্বর শেষে যখন তারা জামাতের সঙ্গে জোট বাঁধল, তখন বহু তরুণ সমর্থকই ধাক্কা খান। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শুদ্রুল আমিনের ভাষায়, ‘তারা নৈতিক জায়গা হারিয়েছে। যারা অতীতের বোঝা ছাড়া ‘নিউ বাংলাদেশ’ চেয়েছিল, তারা এখন বাধ্য হচ্ছে পুরনো শক্তি আর ছাত্র-ইসলামপন্থী জোটের মধ্যে বেছে নিতে।’ একই সুর হিন্দু শিক্ষার্থী শামা দেবনাথের গলাতেও। তিনি মনে করেন, রাজনীতি এখনও ‘এটা না ওটা’—এই গতানুগতিক ছকেই বন্দি।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূস দায়িত্ব নিলেও আইনশৃঙ্খলা আর সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন অনেকে। বৌদ্ধ শিক্ষার্থী হেমা চাকমার মতে, জুলাই বিপ্লবের সেই চেতনা আজ ফিকে। তাঁর অভিযোগ, ‘আগের পরিস্থিতি ভাল ছিল না, কিন্তু এখন হিংসা বেড়েছে। সরকার যথেষ্ট পদক্ষেপ নিচ্ছে না।’ এর সাথে যুক্ত হয়েছে বেকারত্বের জ্বালা আর অর্থনৈতিক সংকট। অথচ এক অদ্ভুত উদ্দীপনা দেখা যাচ্ছে ভোট নিয়ে। সমীক্ষা বলছে, তরুণদের মধ্যে ভোট দেওয়ার হার প্রায় ৯৭ শতাংশ। ৩০০ আসনের লড়াইয়ের পাশাপাশি এবারই প্রথম সংস্কার প্রশ্নে গণভোট হবে, যেখানে বিচার বিভাগ ও নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতার মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে।
বাস্তবতার নিরিখে কেউ কেউ পুরনো দলকেই নিরাপদ ভাবছেন। মাইশা মালিহা যেমন মনে করেন, নতুন ছাত্রদল স্বপ্ন ভেঙেছে, তাই মাঠপর্যায়ে সংগঠন থাকা বিএনপিই তাঁর ভরসা। আবার ২০ বছরের এরিশা তাবাসসুমের ইচ্ছা জামাতকে একবার সুযোগ দেওয়া। তবে অন্ধকারের মাঝেও আশার আলো হয়ে আছেন ৩১ বছরের চিকিৎসক তাসনিম জারা। এনসিপি-র জোটনীতির প্রতিবাদে বেরিয়ে এসে তিনি এখন স্বতন্ত্র প্রার্থী। জারা বিশ্বাস করেন, ‘জুলাই অভ্যুত্থান আমাদের মতো মানুষকে রাজনীতিতে প্রবেশের আশা দিয়েছিল। নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি এক দিনে তৈরি হবে না, কিন্তু সম্ভাবনা আছে।’ একই সুরে ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র এইচ এম আমিরুল করিমও হাল ছাড়তে নারাজ। ব্যালট বাক্স শেষ পর্যন্ত কার ভাগ্য নির্ধারণ করবে তা সময় বলবে, তবে জেন-জি যে বাংলাদেশের রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে, তা বলাই বাহুল্য।















