পদ্মাপাড়ে পালাবদলের পর এবার গঙ্গার ধারের বাসিন্দাদের সঙ্গেও সম্পর্কের সুতো নতুন করে বাঁধতে তৎপর কলকাতা। বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি-র জয় এবং তারেক রহমানের ভাবী প্রধানমন্ত্রী হওয়া নিশ্চিত হতেই সৌহার্দ্যের বার্তা পাঠালেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সৌজন্যের খাতিরে কেবল ফোনে কথোপকথন বা সমাজমাধ্যমে শুভেচ্ছাবার্তাতেই সীমাবদ্ধ থাকেননি তিনি, রীতিমতো ফুল এবং বাংলার বিখ্যাত মিষ্টি পাঠিয়ে ‘তারেকভাই’-কে অভিনন্দন জানিয়েছেন ‘দিদি’। বাংলাদেশের সংবাদ সংস্থা প্রথম আলো সূত্রে জানা গেছে, শনিবার সন্ধ্যায় ঢাকার গুলশনে বিএনপি-র দলীয় কার্যালয়ে সেই উপহার পৌঁছেছে ।
আর তাতেই দুই বাংলার রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে নতুন চর্চা। ১৭ বছরের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে বাংলাদেশের মসনদে বসতে চলেছেন খালেদা-পুত্র তারেক রহমান। নির্বাচনের ফল আসতেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর এক্স হ্যান্ডলে লিখেছিলেন, ‘বাংলাদেশের এই বিপুল জয়ের জন্য অভিনন্দন জানাই আমার তারেকভাইকে, তাঁর দলকে ও অন্যান্য দলকে। সবাই ভালো থাকুন, সুখী থাকুন। আমাদের সঙ্গে সব সময় বাংলাদেশের সুসম্পর্ক বজায় থাকবে, এটাই আমরা কামনা করি।’ এই বার্তায় ‘ভাই’ সম্বোধনই স্পষ্ট করে দিয়েছিল যে, প্রতিবেশী দেশের নতুন জমানার সঙ্গে সম্পর্ককে অন্য মাত্রায় নিয়ে যেতে আগ্রহী নবান্ন। জানা গেছে,শনিবার সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা নাগাদ তারেক রহমানকে ফোন করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দুই নেতার মধ্যে বেশ কিছুক্ষণ কথা হয়।
তবে আলোচনার বিশদ বিবরণ প্রকাশ্যে না এলেও জানা গিয়েছে, ফোনালাপ ছিল অত্যন্ত আন্তরিক। সেই রেশ কাটতে না কাটতেই কলকাতার বাংলাদেশ উপ-হাইকমিশনের মাধ্যমে পাঠানো মুখ্যমন্ত্রীর উপহার পৌঁছয় গুলশনে। বিএনপি-র মিডিয়া সেলের সদস্য আতিকুর রহমান রুমান এবং বিশেষ আধিকারিক মেহেদুল ইসলাম মেহেদি সেই ফুল ও মিষ্টি সাদরে গ্রহণ করেন। হাসিনা জমানায় দু’দেশের মধ্যে আম ও ইলিশের যে ‘খাদ্য-কূটনীতি’র চল ছিল, তারেক জমানাতেও সেই ধারা অব্যাহত রাখতে চাইছেন মমতা। ২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ায় দীর্ঘদিনের চেনা সমীকরণে সাময়িক ছেদ পড়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দুই দেশের সম্পর্কে খানিকটা তিক্ততা তৈরি হলেও সাধারণ নির্বাচনে জনগণের রায় আসার পর পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করেছে। ৩০০টি আসনের মধ্যে ২৯৯টিতে ভোট হয়েছিল, যেখানে বিএনপি একাই পেয়েছে ২০৯টি আসন। শরিকদের নিয়ে তাদের মোট আসন সংখ্যা ২১২। তারেক রহমান নিজে ঢাকা-১৭ এবং বগুড়া-৬ আসন থেকে বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে তাঁর জনপ্রিয়তার প্রমাণ দিয়েছেন।
এক সময় শেখ হাসিনার সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত সখ্য নজর কাড়ত গোটা বিশ্বের। ‘দিদি-বোন’ সম্পর্কের সেই অধ্যায় এখন অতীত। বাংলাদেশের মানুষ ব্যালটের মাধ্যমে নতুন নেতা বেছে নিয়েছেন। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে দুই বাংলার চিরন্তন আবেগ ও সংস্কৃতির সেতুবন্ধনকে আরও মজবুত করতে চাইছেন মমতা। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, মিষ্টির হাড়িতেই লুকিয়ে আছে আগামী দিনের কূটনীতির চাবিকাঠি। অতীতে হাসিনা যেমন তাঁর বাপের বাড়ির হাঁড়িভাঙা আম পাঠিয়ে সম্পর্ক সতেজ রাখতেন, তারেক রহমানও কলকাতার এই সৌজন্যের জবাবে কী পদক্ষেপ করেন, এখন সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে কূটনৈতিক মহল। আপাতত মমতার পাঠানো মিষ্টির স্বাদেই দুই বাংলার আগামী সম্পর্কের ভবিষ্যৎ খুঁজছেন রাজনীতির কারবারিরা।















