নয়াদিল্লির সঙ্গে ঢাকার কূটনৈতিক সংঘাতের ছায়া এবার সরাসরি পর্যটক ভিসার ওপর। দিল্লির দূতাবাস ও আগরতলার উপদূতাবাস আগেই হাত গুটিয়েছিল, এবার কলকাতার বাংলাদেশ উপদূতাবাসও ভারতীয়দের জন্য পর্যটক ভিসা দেওয়া পুরোপুরি বন্ধ করে দিল। মহম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের এই সিদ্ধান্তে দুই দেশের সম্পর্কের শৈত্য আরও বাড়ল বলেই মনে করছে কূটনৈতিক মহল। বিদেশমন্ত্রক সূত্রে খবর, বাংলাদেশে বর্তমান অস্থির পরিস্থিতির দোহাই দিয়ে ভারতীয় পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এই কড়া পদক্ষেপ নিয়েছে ঢাকা। তবে এর নেপথ্যে ভারত-বিরোধী মনোভাবকে উসকে দেওয়ার কৌশল কাজ করছে কি না, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই কাটাছেঁড়া শুরু হয়েছে।
কলকাতার উপদূতাবাস ছিল শেষ ভরসা, যেখান থেকে ভারতীয়রা ওপার বাংলায় যাওয়ার অনুমতি পাচ্ছিলেন। কিন্তু সাম্প্রতিকতম এই নির্দেশের পর সাধারণ পর্যটকদের জন্য বাংলাদেশের পথ আপাতত রুদ্ধ হয়ে গেল। তবে ঢাকা এখনই সব জানলা বন্ধ করেনি। জানা গিয়েছে, কর্মসংস্থান বা বিজনেস ভিসা এবং ব্যবসায়িক প্রয়োজনে যাতায়াতের অনুমতি এখনও বহাল রাখা হয়েছে।
অর্থাৎ রুটিরুজির প্রয়োজনে বা জরুরি বাণিজ্যিক চুক্তির ক্ষেত্রে ভারতীয়রা ওপার বাংলায় পা রাখতে পারবেন। সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের জন্যও ভিসার রাস্তা খোলা রাখা হয়েছে। যেহেতু সাংবাদিকদের তথ্য পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাই করা হয় এবং তাঁদের গতিবিধি কর্তৃপক্ষের নজরে থাকে, তাই তাঁদের ক্ষেত্রে নিরাপত্তার ঝুঁকি কম বলেই মনে করছে ঢাকা। বাংলাদেশের অন্দরে বর্তমানে চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে। জুলাইয়ের ছাত্র আন্দোলন থেকে শুরু করে শেখ হাসিনার পতন— গত কয়েক মাস ধরে ওপার বাংলা কার্যত অগ্নিগর্ভ। সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা এবং কট্টরপন্থীদের আস্ফালনে নিরাপত্তা ব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়েছে। সাম্প্রতিক ছাত্রনেতা ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডে নতুন করে ঘি পড়েছে আগুনে।
এর ওপর আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ওপার বাংলায় সাধারণ নির্বাচন। নির্বাচনের আবহে ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে রাজনৈতিক হানাহানি। সম্প্রতি দুই বিএনপি নেতা খুনের ঘটনায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। ঢাকা দাবি করছে, এই সংঘাতময় পরিবেশে ভিন্দেশি পর্যটকদের নিরাপত্তা দেওয়া তাদের পক্ষে অসম্ভব। যদিও দিল্লির কূটনীতিকদের একাংশ এই ‘নিরাপত্তা’ তত্ত্ব মানতে নারাজ। তাঁদের মতে, ইউনুস সরকার সুকৌশলে ভারতের ওপর চাপ সৃষ্টির রাজনীতি শুরু করেছে।
পর্যটক ভিসা বন্ধ করার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের যাতায়াত রুখে দিয়ে আসলে ভারত-বিদ্বেষী হাওয়াকেই আরও ত্বরান্বিত করতে চাইছে ঢাকা। ভিসা বন্ধের এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়ে কলকাতার উপদূতাবাস বা দিল্লির বাংলাদেশ হাই কমিশন এখনও পর্যন্ত সরকারিভাবে মুখ খোলেনি। কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রকাশ না করায় ধোঁয়াশা আরও বাড়ছে। সব মিলিয়ে দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে যে অবিশ্বাসের দেওয়াল তৈরি হয়েছে, ভিসার এই কড়াকড়ি তাকে আরও মজবুত করল।














