ককপিটের মেঝেতে রক্তাক্ত অবস্থায় লুটিয়ে পড়েছিলেন, তখনও শরীরে আছড়ে পড়ছে ধারালো অস্ত্রের একের পর এক আঘাত; কিন্তু সতেরো বছরের উড়ান অভিজ্ঞতায় বুঝতে পারছিলেন বিমানটি বিপজ্জনকভাবে নিচের দিকে নামছে। সেই মরণপণ অবস্থাতেই শেষ শক্তিটুকু দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে ককপিটের দরজা খুলে দিয়ে ১৭৪ জন যাত্রীর প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন ভারতীয় পাইলট স্মিত মাচ্ছার।
শুক্রবার হাসপাতালের বিছানা থেকেই ভিডিও কলে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে কথা বলার সময় মাঝ-আকাশের সেই রুদ্ধশ্বাস ও নারকীয় অভিজ্ঞতার বিশদ বিবরণ তুলে ধরলেন ফ্লাইদুবাইয়ের এই সাহসী ক্যাপ্টেন। গত ৩০ সেপ্টেম্বর দুবাই থেকে তেল আবিবগামী ‘ফ্লাইদুবাই’-এর এফজেড১০৭৩ বিমানের ককপিটে স্মিত মাচ্ছারের ওপর আচমকা প্রাণঘাতী হামলা চালায় তাঁর ওমানি ফার্স্ট অফিসার (সহ-পাইলট)। হামলায় গুরুতর জখম হয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ার পরও শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বিমানটিকে বাঁচানোর আপ্রাণ লড়াই চালিয়ে যান তিনি। প্রধানমন্ত্রীকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে স্মিত জানান, “যখন মেঝেতে পড়েছিলাম, তখনই টের পাই বিমানটি খাড়া নিচের দিকে নামছে। আমি স্পষ্ট বুঝে গিয়েছিলাম—স্মিত, এটাই তোমার জীবনের শেষ চেষ্টা, আর সময় নেই, দরজাটা ঠিক সামনেই রয়েছে।
মাথায় ও শরীরে অনবরত আঘাত পড়া সত্ত্বেও কোনোমতে দরজাটা খুলে দিতে পেরেছিলাম। এর পরই যাত্রীরা ছুটে এসে হামলাকারীকে চেপে ধরেন। যাত্রীদেরও এই উদ্ধারকাজে সমান ভূমিকা ছিল।” দীর্ঘ বিমান চালনার অভিজ্ঞতাই যে তাঁকে বিপদের আঁচ দিয়েছিল, তা উল্লেখ করে ক্যাপ্টেন মাচ্ছার বলেন, “অসামরিক বিমান পরিবহণে আমি ১৭ বছর ধরে বিমান চালাচ্ছি, গত ১১ বছর ধরে আমি ক্যাপ্টেন। চোখ বন্ধ থাকলেও বিমানের ভেতরে কী ঘটছে তা আমি নিখুঁত বুঝতে পারি। মেঝেতে যখন পড়েছিলাম, বুঝতে পারছিলাম বিমান নামছে এবং এটিই আমার জীবনের শেষ কয়েকটা সেকেন্ড। তবে নিজেকে বাঁচানোর তাগিদের চেয়েও মনের গভীরে এটা স্পষ্ট ছিল যে, এতগুলো মানুষকে আমি কোনোভাবেই মরতে দিতে পারি না।” ঘটনার পর বিমানটিকে ঘুরিয়ে সৌদি আরবের তাবু বিমান বন্দরে জরুরি অবতরণ করানো হয় এবং সেখানে চিকিৎসা শুরু হয় তাঁর। চরম মানসিক চাপের মুখে কীভাবে নিজেকে শান্ত রেখেছিলেন? প্রধানমন্ত্রীর এই প্রশ্নের উত্তরে ক্যাপ্টেন স্মিত জানান, কঠিন পরিস্থিতিতে বরাবরই তিনি হনুমান চালিশা পাঠ করেন। ওই নারকীয় হামলার মুহূর্তেও একটানা হনুমান চালিশা জপ করছিলেন তিনি।
তিনি বলেন, “ঈশ্বরের কৃপা সবসময় আমার সঙ্গে ছিল।” মাঝ-আকাশে এমন ‘৯/১১ ধাঁচের বিপর্যয়’ রুখে দেওয়ার জন্য স্মিতের অসাধারণ ধৈর্য, সাহস ও উপস্থিত বুদ্ধির ভূয়সী প্রশংসা করেন প্রধানমন্ত্রী মোদী। তিনি বলেন, “ভগ্নাংশ সেকেন্ডের মধ্যে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে তুমি এতগুলো মানুষের প্রাণ বাঁচিয়েছ। গোটা দেশ তোমাকে স্বাগত জানাতে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে এবং তোমার সুস্থতার জন্য প্রার্থনা করছে। স্মিত, যখনই কোনো প্রয়োজনে আমাকে দরকার হবে, আমি স্রেফ একটা ফোন কলের দূরত্বে রয়েছি।” স্মিতও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জানান, সুস্থ হতে কিছুটা সময় লাগলেও তিনি ধীরে ধীরে পুরোপুরি সেরে উঠবেন। একই সঙ্গে সংকটের সময়ে দ্রুত সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য সংযুক্ত আরব আমিরশাহি এবং সৌদি আরব সরকারকেও আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।














